- প্রতিদিন সড়কে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল
- হাইওয়ে পুলিশের যথাযথ নজরদারির অভাব
- বেপরোয়া গতি, ক্লান্ত ড্রাইভার-নজরদারির অভাবেই বাড়ছে দুর্ঘটনা
বাংলাদেশে প্রতিদিনই সড়ক ও মহাসড়কে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। প্রতিদিনের পত্রিকার শিরোনামে থাকছে মৃত্যু, আহত, পরিবারহারা মানুষের আর্তনাদ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ক্লান্ত ড্রাইভার, নিয়ম না মানা এবং হাইওয়ে পুলিশের যথাযথ নজরদারির অভাবই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
প্রতিদিন বাড়ছে দুর্ঘটনা, বাড়ছে শঙ্কা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব সড়কে গাড়ি চালকের বেপরোয়া গতি ও প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেকিং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
মূল কারণ: মানবিক ভুল ও অব্যবস্থাপনা
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৭০% দুর্ঘটনার কারণ চালকের মানবিক ভুল। এর মধ্যে রয়েছে— বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও অতিরিক্ত গতি, ক্লান্ত ড্রাইভার – দীর্ঘ সময় ডিউটি শেষে চোখে ঘুম নিয়েই গাড়ি চালানো, উল্টোপথে গাড়ি চালানো ও ভুল ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন না মানা, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো, সিটবেল্ট না বাঁধা, যানবাহনের ত্রুটি–ব্রেক ফেইল, টায়ারের সমস্যা, রাস্তার অব্যবস্থাপনা–গর্ত, অপরিকল্পিত স্পিডব্রেকার, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড না থাকা ইত্যাদি।
হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বহীনতাও এই দুর্ঘটনার হার বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় পুলিশ চেকপোস্টে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ বা ড্রাইভারের ডকুমেন্ট পরীক্ষা না করে শুধু আনুষ্ঠানিকতা সারছে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, “দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে প্রথমে চালকদের প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লান্ত ড্রাইভারকে হাইওয়েতে চালাতে দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে পুলিশের নজরদারি বাড়াতে হবে।”
হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা চেষ্টা করি সড়কে শৃঙ্খলা রাখতে। কিন্তু জনবল সংকট, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব এবং প্রচুর যানবাহনের চাপের কারণে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তবে সম্প্রতি স্পিড গান ব্যবহার শুরু হয়েছে, এতে করে গতিরোধ কিছুটা সম্ভব হচ্ছে।”
সমাধানের পথ
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছেন
১. স্পিড লিমিট কঠোরভাবে প্রয়োগ–প্রতিটি মহাসড়কে ডিজিটাল স্পিড মনিটর বসাতে হবে।
২. চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স যাচাই–অদক্ষ চালকদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
৩. বিশ্রামাগার স্থাপন–দীর্ঘ রুটে ড্রাইভারদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. রাস্তার উন্নয়ন–গর্তমুক্ত রাস্তা, স্পষ্ট সাইনবোর্ড, সঠিক স্পিডব্রেকার।
৫. জরিমানা ও আইন প্রয়োগ–যাদের বিরুদ্ধে গতি বা বেপরোয়া চালানোর অভিযোগ থাকবে তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।
৬. সচেতনতা বৃদ্ধি–যাত্রী, চালক এবং মালিকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মশালা।
সচেতনতার গুরুত্ব
সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শুধু পুলিশ নয়, সাধারণ মানুষেরও ভূমিকা থাকতে হবে। যাত্রীদেরও উচিত বেপরোয়া চালনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার করা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন এক নীরব মহামারি। প্রতিদিন অসংখ্য পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, হাইওয়ে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা—এই সব কিছু একসঙ্গে কার্যকর হলে তবেই মৃত্যুর এই মিছিল কমানো সম্ভব। সময় এসেছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে মানুষের জীবন বাঁচানোর।
এইচআর/ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন