অধ্যাপক আলী রীয়াজ

সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব সংসদে পাস না হলেও কার্যকর হবে

তানজিদ সরওয়ার প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৫, ০৪:৫৯ পিএম
সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব সংসদে পাস না হলেও কার্যকর হবে

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, আসন্ন সংসদ নতুন মেয়াদে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, সংবিধান সংস্কারেরও দায়িত্ব পালন করবে। আগামী সংসদীয় মেয়াদের প্রথম ২৭০ দিন অর্থাৎ প্রায় ৯ মাস সংসদকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলো ওই সময়ের মধ্যেই সংবিধানে যুক্ত করতে হবে। যদি সংসদ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না করতে পারে, তবে প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে।

এই সুপারিশটি এসেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে, যারা সম্প্রতি ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন’ বিষয়ক প্রস্তাবনা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক রীয়াজ জানান, সংসদ যদি সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা চালু হবে। সেই প্রক্রিয়ায় সরকার একটি সংবিধান সংশোধনী বিলের খসড়া তৈরি করবে, যা গণভোটে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘গণভোটে প্রস্তাবগুলো পাস হলে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ তার মূল কাঠামো ও ভাব বজায় রেখে তা অনুমোদন করবে। সংসদ যদি ২৭০ দিনের মধ্যে তা না করে, তবে ওই প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।’

গণভোট আয়োজনের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অধ্যাপক রীয়াজ জানান, কমিশন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়নি।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি হওয়ার পর থেকে জাতীয় নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত যেকোনো সময় গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে।

গণভোট হবে একটি সমন্বিত প্রশ্নে (প্যাকেজ আকারে)—যেখানে ভোটারদের জিজ্ঞাসা করা হবে তারা জুলাই সনদ ও সংশ্লিষ্ট সংবিধান সংশোধনী খসড়াকে সমর্থন করেন কি না।

কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (অমতসূচক নোট) ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক রীয়াজ বলেন, এসব বিষয় জনগণের বিচারেই সোপর্দ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে বলেছি দলগুলোর ভিন্নমত জনগণের সামনে উন্মুক্ত করতে। জনগণের রায় পাওয়ার পর রাজনৈতিক দল নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে।”ষ’

আলী রীয়াজের মতে, সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের সম্মতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই কমিশন ৪৮টি বিষয়ে জনগণের মতামতকেই প্রধান ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে।

 কমিশনের সুপারিশের সারসংক্ষেপ

ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী—

১. আগামী সংসদীয় মেয়াদের প্রথম ২৭০ দিন সংবিধান সংস্কারের জন্য নির্ধারিত থাকবে।

২. গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলো এই সময়ের মধ্যে সংসদে পাস করতে হবে।

৩. সংসদ তা করতে ব্যর্থ হলে, প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে।

৪. প্রয়োজনে সরকার খসড়া বিল আকারে প্রস্তাবগুলো তৈরি করে গণভোটে দিতে পারবে।

৫. গণভোট হবে একটি সমন্বিত প্রশ্নে, যাতে জনগণ পূর্ণ প্যাকেজ সমর্থন বা প্রত্যাখ্যান করবে।

‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য গঠনের রূপরেখা তৈরি করতে কাজ করছে ঐকমত্য কমিশন।

এ প্রক্রিয়ার লক্ষ্য—রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব নিরসন করে একটি সমন্বিত সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাব কার্যকর হলে সংসদের ওপর সংবিধান সংস্কারের সরাসরি দায়িত্ব ও জবাবদিহি উভয়ই বর্তাবে। আর সংসদ তা সম্পন্ন করতে না পারলে, ‘স্বয়ংক্রিয় সংযোজন’ ধারা গণরায়কে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেবে—যা বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে নতুন নজির তৈরি করতে পারবে।

সংবাদ সম্মেলনটি আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ ছাড়াও অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিশনের একাধিক সদস্য জানান, তারা আশা করছেন সরকার দ্রুতই গণভোট আয়োজন ও সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে।

সংসদ কাজ করবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে প্রথম ৯ মাস। গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাবগুলো সংসদে অনুমোদন পাবে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে। সংসদ ব্যর্থ হলে, সরকার বিল আকারে প্রস্তাব তৈরি করে গণভোটে দেবে।

জনগণের সম্মতি অসম্মতিকেই ধরা হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে।

ইএইচ