ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা: ‘সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না’

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ৯, ২০২৫, ১১:৫৮ পিএম
ঢাকার কূটনৈতিক বার্তা: ‘সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না’

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে ‘অযথার্থ, শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং কূটনৈতিক সৌজন্যের পরিপন্থী’ বলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ঢাকা।

শনিবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস এম মাহবুবুল আলম এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা মনে করি রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্য সঠিক, গঠনমূলক ও কূটনৈতিক সৌজন্যমূলক ছিল না। বাংলাদেশের সার্বভৌম নেতৃত্ব নিয়ে এমন মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনভিপ্রেত।

সম্প্রতি ভারতের নেটওয়ার্ক–১৮ গ্রুপের প্রধান সম্পাদক রাহুল জোশিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজনাথ সিং বলেন, আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো টানাপোড়েন চাই না, তবে ইউনূসকে তার বক্তব্যে সতর্ক থাকতে হবে।

সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে ভারতের জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফার্স্টপোস্ট। এতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের সাম্প্রতিক কিছু আলোচনামূলক মন্তব্য নিয়ে নয়াদিল্লি অসন্তুষ্ট।

বাংলাদেশ সরকারের দৃষ্টিতে, এই মন্তব্য কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের নয়, বরং দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুখপাত্র মাহবুবুল আলম বলেন, আমরা সবসময় বিশ্বাস করি, সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে গঠনমূলক সম্পর্কই টেকসই। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করাই আমাদের নীতিগত অবস্থান।

তিনি আরও বলেন, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি সমাধান হয় সংলাপ ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সর্বসমক্ষে এমন মন্তব্যে নয়।

যদিও রাজনাথ সিং সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে বলেন যে, ভারত বাংলাদেশকে ‘প্রতিবেশী বন্ধুর’ মতোই দেখে এবং কোনো দ্বন্দ্ব চায় না, তবুও তাঁর মন্তব্যের  সতর্ক থাকার পরামর্শ অংশটি ঢাকার কূটনৈতিক মহলে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে।

একজন সিনিয়র কূটনৈতিক সূত্রের ভাষায়, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব। তাঁকে কেন্দ্র করে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

ঢাকা বারবার বলছে, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থে গঠিত একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক, যেখানে উভয় দেশ পরস্পরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে আসছে।

মুখপাত্র মাহবুবুল আলম বলেন, আমরা বিশ্বাস করি দুই দেশের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য দেখা দিলেও তা সৌজন্যপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমেই মীমাংসা সম্ভব। শালীনতা ও শ্রদ্ধাই কূটনীতির আসল শক্তি।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনাথ সিংয়ের এই মন্তব্যকে ঢাকার “সংযত কিন্তু দৃঢ় প্রতিক্রিয়া ভারতের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় বাংলাদেশ এখন তার কূটনৈতিক অবস্থান রক্ষায় যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক (অব.) ড. সৈয়দ রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন আর নির্ভরশীল নীতিতে চলে না। যে কোনো সম্পর্কই এখন পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে চায় ঢাকা। এই প্রতিক্রিয়া মূলত সেই অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে তৎপরতা, পানি বণ্টন ও বাণিজ্য জটিলতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল বিষয় আলোচনায় এসেছে। তার মধ্যে এমন মন্তব্য উভয় দেশের জনমতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে তারা এটিও উল্লেখ করেন উভয় দেশের প্রশাসনিক ও সামরিক পর্যায়ে এখনো যোগাযোগ অত্যন্ত সক্রিয়, যা সম্পর্কের স্থিতি বজায় রাখতে সহায়তা করছে।

বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া মূলত সংযমী, তবে বার্তাটি স্পষ্ট ঢাকা এখন কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সমতার ভিত্তিতে কথা বলতে চায়।

রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্য যদি ভুল ব্যাখ্যার জন্ম দিয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত মীমাংসার পথে আসা প্রয়োজন, কারণ দুই দেশের জনগণই চায় বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক আরও গভীর হোক, উত্তেজনা নয়।

ইএইচ