মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার আগের রাতে রাজধানী যেন হঠাৎই নাশকতার ছায়ায় ঢেকে যায়।
রোববার রাত জুড়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ, আগুন এবং নাশকতার ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে। বিশেষ করে বাড্ডায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
রোববার রাত ১০টার কিছু আগে বাড্ডার পূর্বাঞ্চলের একটি ব্যস্ত সড়কে চলন্ত অবস্থায় হঠাৎই বাসটির পেছনের দিকে আগুন দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, দু’জন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে দ্রুতগতিতে যানটির পাশে এসে কিছু একটা নিক্ষেপ করেই পালিয়ে যায়। মুহূর্তেই বাসের ভেতরে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত যাত্রীদের নামিয়ে ফেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন স্থানীয়রা। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফায়ার সার্ভিসের বাড্ডা স্টেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, আগুন খুব বড় আকার ধারণ করেনি, তবে নাশকতার ধরন দেখে বিষয়টি গুরুত্ব নিয়ে তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ। কোনো যাত্রী হতাহত হয়নি, তবে বাসটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই ঘটনার পর পুরো এলাকা একসময় থমথমে হয়ে পড়ে। দোকানপাট দ্রুত শাটার নামিয়ে দেয়, রাস্তায় লোকজনের চলাচল কমে যায়। পুলিশের একাধিক টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।
এর আগে সন্ধ্যায় রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারার সামনে চলন্ত গাড়িতে দুটি ককটেল নিক্ষেপ করে দুর্বৃত্তরা। সড়কে যানজট থাকায় আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ে। গাড়িচালক দ্রুত গাড়িটি থামিয়ে নামতে না নামতেই আশেপাশের মানুষ ছুটোছুটি শুরু করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, এতে কেউ আহত না হলেও বিস্ফোরণের শব্দে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে পড়ে।
ঘটনার পরপরই ডিএমপির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে। প্রাথমিক ধারণা—এটি ছিল ছোট আকারের ইম্প্রোভাইজড বিস্ফোরক (IED)।
রাত ৯টার দিকে নতুন করে আরেকটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় শান্তিনগর এলাকায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বাসার সামনে। তাকে লক্ষ্য করে নাকি সাধারণভাবে আতঙ্ক ছড়াতেই এই বিস্ফোরণ, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেয়নি পুলিশ।
এলাকাবাসীর দাবি, দুইজন ব্যক্তি হেঁটে এসে রাস্তার পাশে কিছু ফেলেই দ্রুত পালিয়ে যান। এরপরই ককটেলসদৃশ বস্তুটি বিস্ফোরিত হয়। ঘটনাটি তদন্ত করছে গোয়েন্দা সংস্থা।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাংলামোটর এলাকায় এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক দলটির কয়েকজন কর্মী জানান, তাঁরা অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, এমন সময়ে হঠাৎই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। যদিও সেখানে কোনো হতাহতের খবর নেই, তবে ঘটনাটি স্পষ্টভাবেই সমন্বিত নাশকতার অংশ বলে মনে করছেন তারা।
আগামীকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার কথা। গত সপ্তাহ থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত থাকায় প্রশাসন আগেই সতর্ক অবস্থানে ছিল। কিন্তু রোববারের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগ নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন—ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। বরং রায়কে ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার উদ্দেশ্যেই একদল দুর্বৃত্ত পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
এক উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, আজ রাতের ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, কিছু গোষ্ঠী চাচ্ছে রাজধানীতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে। আমরা কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। আশা করছি দ্রুতই জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
শহরের পরিবেশ রাতে অস্থির থাকলেও পুলিশ বলছে, সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। আগের দিনের মতোই সোমবার ভোর থেকে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চেকপোস্ট স্থাপন করা হচ্ছে, এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
এক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কেউ গুজবে কান দেবেন না। আমরা পরিস্থিতির ওপর সর্বোচ্চ নজর রেখেছি।
সব মিলিয়ে, রায়ের আগের রাতেই রাজধানী ঢাকাকে নাড়িয়ে দিয়েছে একাধিক এলাকায় সমন্বিত নাশকতার ঘটনা। বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ এবং টানা সন্ত্রাসী তৎপরতায় নাগরিক উদ্বেগ বাড়লেও, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে—যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন