বঙ্গোপসাগরে ‘সেনিয়ার’: বুধবারই সৃষ্টি হতে পারে নতুন ঘূর্ণিঝড়

নিজস্ব প্রতিবেদক  প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ১০:৪৩ পিএম
বঙ্গোপসাগরে ‘সেনিয়ার’: বুধবারই সৃষ্টি হতে পারে নতুন ঘূর্ণিঝড়

বঙ্গোপসাগরের ওপর আবারও তৈরি হতে চলেছে নতুন একটি ঘূর্ণিঝড়। নভেম্বরের শেষ প্রান্তে এসে সাগরে দ্রুত ঘনীভূত হওয়া নিম্নচাপের গতিবিধি ইঙ্গিত দিচ্ছে সম্ভাব্য এক শক্তিশালী ঝড়ের। 

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের বুধবারের মধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরের ওপর এই ঘূর্ণিঝড়টি তৈরি হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়টি সৃষ্টি হলে এর নাম হবে ‘সেনিয়ার’, যার অর্থ ‘সিংহ’। নাম থেকেই যেন বোঝা যায় এর সম্ভাব্য তীব্রতার ইঙ্গিত। 

নিম্নচাপ থেকে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় গঠনের ধাপগুলো স্পষ্ট শনিবার যে নিম্নচাপটি আন্দামান সাগর–মালাক্কা প্রণালীর কাছাকাছি তৈরি হয়েছিল, সেটি ইতোমধ্যে আরও ঘনীভূত হয়ে সুস্পষ্ট নিম্নচাপে রূপ নিয়েছে। এই সিস্টেমটি পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছে। 

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, সোমবারের মধ্যেই এটি গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে, যা পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় আরও শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে সক্ষম। সাধারণত এ ধরনের সিস্টেম আন্দামান সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে প্রবেশ করলে সাগরের উষ্ণজলীয় পরিবেশ তার শক্তি বৃদ্ধির উপযোগী হয়ে ওঠে। বর্তমান অবস্থায় সবকিছুই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পক্ষে অনুকূল—সাগরের তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে, বাতাসের দিক ও গতি অনুকূলে, এবং সিস্টেমের ওপর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা নেই। 

ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়ার’: নামেই লুকিয়ে আছে শক্তির ইঙ্গিত ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে ‘সেনিয়ার’, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রস্তাব করেছে। আরবি উৎসবাহী এই শব্দের অর্থ ‘সিংহ’। 

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নামটি কেবল প্রতীকী নয়; বরং ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য শক্তি বিবেচনায় এই নাম অনেকটাই যুক্তিযুক্ত বলেও মনে করছেন তারা। যদিও এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না ঝড়টি কতটা শক্তিশালী হবে কিংবা কোন তটে আছড়ে পড়বে। তবে অতীতে নভেম্বর–ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বেশিরভাগ ঘূর্ণিঝড়ই শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন। কোন পথে যেতে পারে ঘূর্ণিঝড়টি—অভিমুখ এখনো অনিশ্চিত বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়ার’ কোন দিকে যাবে?

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সিস্টেমটি এখনো খুব প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় সঠিক অভিমুখ অনুমান করা কঠিন। সাগরের ওপর ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ধারণে অনেকগুলো উপাদান কাজ করে—উচ্চচাপ বলয়, বায়ুচাপের তারতম্য, বায়ুর দিক, সাবট্রপিক্যাল রিজ, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইত্যাদি। 

আইএমডি জানিয়েছে, মঙ্গলবার বা বুধবার নাগাদ অভিমুখ কিছুটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। বর্তমানে যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা থেকে অনুমান করা যায় ঝড়টি ভারতের পূর্ব উপকূলের দিকে যেতে পারে অথবা বঙ্গোপসাগরের উত্তর–উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। ফলে বাংলাদেশ, আন্দামান–নিকোবর অঞ্চল, অন্ধ্র–ওড়িশা উপকূল এবং বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চল—সবক্ষেত্রেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 সম্ভাব্য গতিবেগ এখনই কিছু বলা কঠিন ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিবেগ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি আলিপুর আবহাওয়া দফতর। তাদের মতে, ঝড়টি সাগরে অবস্থানকালে শক্তি সঞ্চয় করতে পারে এবং তা প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এটি অতি প্রবল বা অত্যন্ত প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে কি না, তা জানার জন্য আরও ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা প্রয়োজন। 

দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি ও শীতের ওপর প্রভাব আবহাওয়াবিদদের ধারণা, নভেম্বরের শেষভাগ এবং ডিসেম্বরের প্রথম দিক ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি হতে পারে। এতে শীত সাময়িকভাবে কমে যাবে। ডিসেম্বরের ৪ বা ৫ তারিখের আগে দক্ষিণবঙ্গে শীত নামার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে। হিমালয়ের পাদদেশীয় এলাকাগুলোতে রাতের তাপমাত্রায় খুব একটা পরিবর্তন আসছে না। উত্তরবঙ্গেও একই অবস্থা—শীত ঠিক যেমন রয়েছে তেমনই থাকবে। অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পরেও বড় ধরনের ঠান্ডা বাড়ার কোনো লক্ষণ এখনই দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা? যদিও এখনো ঘূর্ণিঝড়ের সুনির্দিষ্ট গতিপথ জানা যায়নি, তবুও বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এ ধরনের সিস্টেম তৈরি হলে নিয়মিত নজরদারি করে থাকে। দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো—বিশেষ করে বরিশাল, খুলনা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে—ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে সবসময় প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। 

স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘূর্ণিঝড় যদি উত্তরে দিকে এগোয়, তাহলে বাংলাদেশকেও সতর্ক থাকতে হতে পারে। তবে এ মুহূর্তে আতঙ্কের কারণ নেই বরং নিয়মিত আপডেট অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এখনকার বাস্তব চিত্র—সতর্কতা প্রয়োজন, আতঙ্ক নয় আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে যে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তা দ্রুত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো তথ্য নেই যা জাতীয় পর্যায়ে জরুরি সতর্কতা জারি করার মতো। বিজ্ঞানীরা বরাবরের মতোই বলছেনঘূর্ণিঝড় নিয়ে আগেভাগে সিদ্ধান্ত নয়, বরং সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়াই উত্তম। তথ্য-উপাত্ত বিচার করলে এটাই স্পষ্ট—ঘূর্ণিঝড় ‘সেনিয়ার’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হলেও তার শক্তি, গতি ও অভিমুখ জানতে আরও ২ দিন সময় লাগবে।

ইএইচ