সন্ধ্যায় জাতীয় যাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘মুসলিম পারিবারিক আইন: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, দেশের আলেম-ওলামাদের দীর্ঘ ৫৪ বছরের সংগ্রাম ও পরিশ্রম ব্যর্থ হয়নি।
বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ড. খালিদ বলেন, ৫৪ বছর ধরে নিপীড়ন, নির্যাতন এবং অবহেলার মধ্যেও ইসলামি শক্তি মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করেছে। পূর্ব দিগন্তে নতুন সূর্য উঁকি দিচ্ছে, তবে ওঠার কাজ এখনো বাকি। এই সময়ে আমাদের ঐক্য বজায় রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন ইসলামের শরীয়তের সঙ্গে অনেক ধারা নিয়ে সাংঘর্ষিক। সেসময়কার আলেম-ওলামারা এই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম পরিচালনা করেছিলেন। তবুও তখনকার সামরিক শাসক আইয়ুব খানের দ্বারা আইনটি প্রণয়ন ও পাস করা হয়।
ড. খালিদ হাইলাইট করেন, শরীয়তে হিলে বিয়ে সম্পূর্ণরূপে হারাম। তিনি বলেন, তালাকের যথেচ্ছ ব্যবহার সমাজে অনেক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর শিশুদের কান্না ও পরিবারের মধ্যে কষ্ট দেখা দেয়। অনেক সময় এক শ্রেণির মানুষ নারীদের হিলে বিয়ে দিয়ে ইসলামের ব্যাখ্যা বিকৃত করার চেষ্টা চালান। এটি নারীর প্রতি অবমাননাকর এবং ইসলামের মর্যাদায় আঘাত আনে।
উপদেষ্টা বলেন, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে দণ্ডবিধি আরোপের ক্ষমতা আলেম বা মুফতির হাতে নেই। তারা কেবল ফতোয়া প্রদান করতে পারেন এবং কুরআন-হাদীসের আলোকে নৈতিক ও বিধিবিষয়ক পরামর্শ দিতে পারেন। বিচার ও রায়ের কার্যকরতা সম্পূর্ণভাবে আদালত ও প্রশাসনের দায়িত্ব।
তিনি সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান, যাতে কোনো বিভ্রান্তি বা অসাংবিধানিক প্রয়োগ না হয়। শরিয়াহ আইন প্রচলনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা শরিয়াহ আইন প্রচলনের বিষয়ে ড. খালিদ বলেন, এই দাবি আমরা ৫৪ বছর ধরে উচ্চারণ করে আসছি। দাবি জানাতে কোনো আপত্তি নেই, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদের অধিকাংশ আসন শরীয়ত মেনে চলে এমন মানুষের দ্বারা পূর্ণ হবে না, ততক্ষণ দাবির বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এজন্য আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো এক বা দুজনের দ্বারা পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ড. খালিদের এই বক্তব্যের মাধ্যমে দেশের আলেম-ওলামাদের ঐক্য ও শ্রমকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ইসলামি শক্তি সংরক্ষণের জন্য ধৈর্য, একাগ্রতা ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
সেমিনারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. নকীব মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ, আর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এবিএম মাহবুবুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. শামছুল আলম এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. শহীদুল ইসলাম।
তারা পারিবারিক আইন ও ইসলামী বিধি সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের সমাজে এই আইন প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করেন। সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামা, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
উপস্থিতরা আলোচনা শেষে একমত হন, যে ইসলামী মূল্যবোধের সংরক্ষণ ও পারিবারিক আইনের যথাযথ প্রয়োগে শিক্ষিত ও সচেতন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের বক্তব্য দেশের আলেম-ওলামাদের দীর্ঘ সংগ্রামকে মূল্যায়ন করে এবং ভবিষ্যতে শরীয়তানুগত আইন বাস্তবায়নের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করার আহ্বান জানায়।
তিনি পুনরায় বলেন, দীর্ঘদিনের মেহনত কখনও ব্যর্থ হয় না, বরং এটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়ায়। সেমিনার শেষে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, ইসলামি আইন ও পারিবারিক আইন নিয়ে দেশের সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হলে আলেম-ওলামাদের পরিশ্রম ও ধৈর্যের ওপরই ভবিষ্যতের আশা নির্ভর করবে।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন