দুই উপদেষ্টাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন বিতর্ক 

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৬, ২০২৫, ১১:৩৬ পিএম
দুই উপদেষ্টাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন বিতর্ক 

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে যেকোনো দিন। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পদাধিকারের অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘনীভূত হয়েছে। 

দুই উপদেষ্টার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, সম্ভাব্য নির্বাচন অংশগ্রহণ, এবং সরকারের নিরপেক্ষ অবস্থান কতটা নিশ্চিত, তা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে তীব্র আলোচনা চলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টাদের অংশগ্রহণে খুব বেশি আলোড়ন তৈরি না হলেও, গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া কিছু তরুণের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নতুন দলটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলে, এবং সেই দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে দুই উপদেষ্টার সংশ্লিষ্টতা উঠে আসায়, সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে বাড়তে থাকে সমালোচনা।

সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এখনও সিদ্ধান্ত জানাননি তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না। বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন দল এনসিপির ঘনিষ্ঠ পরিসরে অবস্থান করছেন। তবে তিনি নিজে এ বিষয়ে কোনো পরিষ্কার বক্তব্য দেননি। এতে করে প্রশ্ন উঠেছে: রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী একজন উপদেষ্টা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর সিদ্ধান্তহীনতা নির্বাচনী পরিবেশ ও সরকারের নিরপেক্ষতা, উভয় ক্ষেত্রে একটি অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

অন্যদিকে, আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া জানিয়েছেন তিনি ঢাকা থেকে ভোট করতে চান। নির্বাচন সামনে রেখে তিনি উপদেষ্টা পদ ছাড়তে পারেন, এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তবে কোন রাজনৈতিক দল থেকে তিনি প্রার্থী হতে চান, সেটি সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা নেই। এখানেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থায় তিনি রাজনৈতিক তৎপরতা চালালে তা কতটা নৈতিক, সে প্রশ্নে সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারটি গঠন করা হয়েছে এমনভাবে যাতে এটি মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীতিবোধ অনুসরণ করে। সেই হিসেবে সরকারটি পুরোপুরি নির্দলীয় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে বিএনপি, জামায়াত সমর্থিত একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি এবং ছাত্রদের নতুন দল এনসিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সরকারের পূর্ণ নিরপেক্ষতা কতটা বজায় রাখতে পেরেছে, এ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত হলো, এই দুই উপদেষ্টার বাইরে আর কেউ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি। ফলে সরকারের মধ্যে থাকা দুজন সম্ভাব্য প্রার্থীই জনমতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন।

এক সংবিধান বিশেষজ্ঞের ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনপ্রণালী প্রায় পুরোপুরি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে। সেক্ষেত্রে এখানে থাকা কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে এটি সরকারের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ব্যাহত করে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাওয়া সুবিধা, প্রশাসনিক কর্তৃত্বে প্রবেশাধিকার, এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ, এসবই নির্বাচনে প্রার্থীর জন্য অসামান্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে। এগুলোই মূলত 'স্বার্থের সংঘাত' বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট হিসেবে বিবেচিত।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, যিনি সন্দ্বীপ এলাকায় বেশ জনপ্রিয়, ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন না। 

তার যুক্তি, তিনি নিরপেক্ষতার শপথ নিয়েছেন, উপদেষ্টা হিসেবে প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ করে নিজ রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, এবং তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নেই, তাই রাজনীতিবিদদের বঞ্চিত করে প্রার্থী হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। ফাওজুল কবির ঘোষণার পরই প্রশ্ন উঠেছে যদি তিনি নিরপেক্ষতার শপথের কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে একই যুক্তি কি মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়? অনেকেই মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত সরকারের অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধের একটি ইতিবাচক উদাহরণ। কিন্তু অন্য দুজন উপদেষ্টার অস্থির অবস্থান সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কয়েক মাস আগে দুই উপদেষ্টাকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়। বিশেষত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় এই পরামর্শ জানানো হয়। কারণ তখন থেকেই তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। কিন্তু তারা সেই পরামর্শ গুরুত্ব দেননি। বহাল থেকেই রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো বা প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা, কেবল নৈতিক প্রশ্নই নয়, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকেও ঝুঁকিতে ফেলে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

নির্বাচনের দিনক্ষণ এখন হাতের মুঠোয়। তফসিল ঘোষণার মুহূর্ত এগিয়ে আসার সাথে সাথে দুই উপদেষ্টার অবস্থান নিয়ে চাপ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে, তারা কি তফসিল ঘোষণার আগে পদত্যাগ করবেন? নাকি সরকারে থেকেই নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করবেন? এই অবস্থান কি সরকারের নিরপেক্ষতার মূল দর্শনকে বিঘ্নিত করবে? রাজনৈতিক মহলের ধারণা, নির্বাচনী সুষ্ঠতা নিশ্চিত করতে হলে তফসিল ঘোষণার আগেই তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করা জরুরি।

গণ অভ্যুত্থানের পর জনগণ আশা করেছিল, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হবে। ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনী সুবিধা নেওয়ার যে প্রবণতা অতীতে দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তা আর দেখা যাবে না। কিন্তু বিতর্কিত দুই উপদেষ্টার অবস্থান অনেককে সেই পুরোনো দিনের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেই এমন স্বার্থসংঘাতের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তবে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে পড়বে।

মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদের নির্বাচনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এখন শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক ভিত্তি এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ, সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন: উপদেষ্টারা যদি নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তবে প্রথমেই পদত্যাগ করা উচিত। আর যদি সরকারে থাকতে চান, তবে সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে হবে যে তাঁরা কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাচ্ছেন না। সিদ্ধান্তহীনতা শুধু বিতর্কই নয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর অবিশ্বাসও বাড়ায়। নির্বাচনের বাকি সময়ে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, এই প্রশ্নগুলোর গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা। কারণ, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সবার আগে।

ইএইচ