ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে প্রস্তুত ইসি

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৭, ২০২৫, ১১:২১ পিএম
ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে প্রস্তুত ইসি

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসকে অবহিত করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। 

রোববার সন্ধ্যায় রাষ্ট্র অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি জানান, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব কারিগরি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুসংহতভাবে অগ্রসর হচ্ছে। 

বৈঠকে উপস্থিত কমিশনাররা জানান, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কেন্দ্র তালিকা প্রস্তুতি, ভোটগ্রহণ সামগ্রী সংরক্ষণ, ইলেকট্রনিক ও লজিস্টিক সহায়তা, মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়, সব ক্ষেত্রে কমিশনের কাজ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই শেষ হয়েছে। 

তারা বলেন, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন একটি চ্যালেঞ্জিং প্রক্রিয়া হলেও কমিশনের অভিজ্ঞ কর্মী ও পরিকল্পনা কাঠামো তা সফলভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস কমিশনের প্রস্তুতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এই নির্বাচনের মূল লক্ষ্য। 

তিনি কমিশনকে পূর্ণ সহায়তার আশ্বাস দিয়ে বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতি নতুন দিগন্তে পা রাখবে। ইসি এখন চালকের আসনে, আপনাদের উপর আস্থাই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে সঠিক পথে রাখবে। 

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও আলোচনাহীন করতে নির্বাহী বিভাগ কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠ প্রশাসনকে সক্রিয় রাখবে। 

তিনি স্পষ্ট করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো পর্যায় থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই; বরং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে ইসিকে শক্তিশালী করাই সরকারের দায়িত্ব।

বৈঠকে সিইসির পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ, মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ। তারা পর্যায়ক্রমে নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। 

মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের বাছাই, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং গণভোটের ব্যালট ডিজাইনসহ নানা বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। 

অন্যদিকে সরকারের পক্ষে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। 

তারা বলেন, নির্বাচন-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগেই প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্র-সংলগ্ন এলাকায় নিরাপত্তা বলয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিম গঠন এবং গোয়েন্দা নজরদারি পরিকল্পনা নিয়ে তারা ইসির সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

ইসির মতে, একই দিনে দুইটি বড় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম আয়োজনের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যালটপেপার প্রস্তুতি, গণভোট পরিচালনার বিশেষ নির্দেশিকা, কেন্দ্রভিত্তিক অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ, ভোটকেন্দ্রে ভোটার ব্যবস্থাপনা। সিইসি নাসির উদ্দিন জানান, গণভোটের ব্যালটপেপার জাতীয় নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি আলাদা রঙে ছাপানো হবে, যাতে ভোটাররা বিভ্রান্ত না হন। প্রতিটি কেন্দ্রে অতিরিক্ত কর্মকর্তার পাশাপাশি বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগের কাজ শেষ পর্যায়ে। 

তিনি বলেন, গণভোটের কারণে ভোটের দিন সময় কিছুটা বেশি লাগতে পারে। কিন্তু আমরা ভোটগ্রহণের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নিয়েছি।

প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস বৈঠকে উল্লেখ করেন, নির্বাচনকে ঘিরে দেশবাসীর মধ্যে যেকোনো বিভ্রান্তি দূর করতে কমিশনকে আরও সক্রিয় যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করতে হবে। 

তিনি বলেন, নাগরিকের আস্থা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তথ্যের স্বচ্ছতা ও প্রতিটি সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান ভোটারদের আরও আত্মবিশ্বাসী করবে। তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের ধারাবাহিক সংলাপ ও পরামর্শের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। 

তার মতে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব দলের আস্থার পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।


বৈঠকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান জানান, সারা দেশে তিনস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে ভোটকেন্দ্র এলাকায় স্থায়ী মোতায়েন, মোবাইল টহল, র্যাপিড রেসপন্স ইউনিট। 

তিনি বলেন, গুজব, বিভ্রান্তি, সাইবার অপপ্রচার রোধে বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকের শেষ পর্বে কমিশনাররা জানান, মাঠপর্যায়ের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ পরিচিতি ও ব্রিফিং সম্পন্ন করেছে। কমিশনার তাহমিদা আহমদ বলেন, যে ধরনের নির্বাচন দেশ প্রত্যাশা করছে, তা আয়োজনের সক্ষমতা কমিশনের আছে। আমাদের টিম এখন সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।

সিইসি জানান, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধ লক্ষ্য করে নির্বাচন কমিশন তারিখ নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই নির্বাচনসূচি প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, জনগণ অপেক্ষায় আছে। আমরাও প্রস্তুত। সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেটই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি।

ইএইচ