বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. রিয়াজ হামিদুল্লাহকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় তলব করা হয়েছে।
সোমবার রাতে তিনি সরকারের নির্দেশে বিশেষ আহবানে সাড়া দিয়ে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র এবং জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের শীতলতা এবং বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যুতে টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং ভারতের কিছু সাম্প্রতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের রসায়ন কিছুটা বদলেছে। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিনিধির সাথে সরাসরি আলোচনার প্রয়োজন মনে করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে মূলত বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনার জন্য ডাকা হয়েছে। সাধারণত কোনো দেশ যখন তাদের হাইকমিশনারকে জরুরি ভিত্তিতে তলব করে, তখন সেটিকে কূটনৈতিক পরিভাষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়।
গত কয়েক মাসে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন চুক্তি এবং ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকার পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে রিয়াজ হামিদুল্লাহ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছিলেন। হঠাৎ করে তাকে ঢাকায় তলব করা নির্দেশ করছে যে, কোনো বড় ধরণের নীতিগত পরিবর্তন অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংকটের বিষয়ে সরকার সরাসরি তাঁর সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে চায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতের সাথে বর্তমান সম্পর্কের যে সমীকরণ, সেটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। রিয়াজ হামিদুল্লাহকে ডাকা হয়েছে মূলত বর্তমান পরিস্থিতির সর্বশেষ ব্রিফিং নিতে এবং সামনে আমরা কীভাবে এগোব তার একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে।
মো. রিয়াজ হামিদুল্লাহ একজন পেশাদার এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তিনি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন এমন এক সময়ে যখন দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক পরীক্ষা দিচ্ছে। তাঁর এই আকস্মিক ঢাকা প্রত্যাবর্তন নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের কাজের পরিধি বা পরবর্তী কর্মপরিকল্পনায় কোনো বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক ধরণের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানে ভারতের কর্মকর্তাদের সাথে হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহর সাম্প্রতিক আলোচনার ফলাফল কী ছিল, সেটি জানাও সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাইকমিশনারকে তলব করা মানে এই নয় যে সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে, বরং এটি এক ধরণের 'কূটনৈতিক শক্ত অবস্থান' প্রকাশ হতে পারে। ভারতের সাথে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হচ্ছে বা সেখানে কোনো ধরণের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতেই তাঁকে সাময়িকভাবে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রিয়াজ হামিদুল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়তো শিগগিরই দিল্লিতে একটি বিশেষ বার্তা পাঠাবে।
সোমবার রাতে ঢাকায় পৌঁছানোর পর মঙ্গলবার থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে রিয়াজ হামিদুল্লাহর কয়েক দফা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তিনি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করতে পারেন।
সব মিলিয়ে, ভারতের সাথে সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে নাকি আরও কঠোর অবস্থান নিতে রিয়াজ হামিদুল্লাহকে এই জরুরি ডাক দেওয়া হলো তা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে স্পষ্ট হবে। তবে এই মুহূর্তে হাইকমিশনারের ঢাকা অবস্থান ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতির চাপে এই সম্পর্ক এখন এক কঠিন বাঁকে দাঁড়িয়ে। রিয়াজ হামিদুল্লাহর এই জরুরি সফর প্রমাণ করে যে, সরকার ভারতের সাথে সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস করতে রাজি নয়।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন