ঢাকার ভৌগোলিক রূপ ও নগর পরিকল্পনা

রাজউক চেয়ারম্যানের সতর্কবার্তা এবং আগামীর বাসযোগ্য রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
রাজউক চেয়ারম্যানের সতর্কবার্তা এবং আগামীর বাসযোগ্য রাজধানী

একটি শহরের প্রাণ হলো তার সঠিক পরিকল্পনা। কিন্তু ঢাকা কি সেই পরিকল্পনার ছায়াতলে বেড়ে উঠেছে? শুক্রবার বিকেলে এক তাৎপর্যপূর্ণ মতবিনিময় সভায় এই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।

তার মতে, ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে ঢাকার মতো সুন্দর রাজধানী পৃথিবীতে বিরল, কিন্তু আমরাই আমাদের অপরিণামদর্শী আচরণে এই সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিচ্ছি।

ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা নদ, নদী এবং এর অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলো একে এক সময় প্রাচ্যের ভেনিসে রূপান্তরিত করেছিল। রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সেই সত্য, সৃষ্টিকর্তা ঢাকাকে অপরূপ সৌন্দর্যে সাজিয়ে দিলেও নাগরিক সমাজ ও আবাসন নির্মাতারা সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে জলাশয় ভরাট, কৃষি জমি দখল এবং নিয়ম না মেনে বহুতল ভবন নির্মাণ ঢাকাকে এক কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত করেছে। 

চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়েছেন, শহর ধ্বংসের পেছনে দায়ী আমাদেরই অপরিকল্পিত নগরায়ন।

মতবিনিময় সভায় চেয়ারম্যান নগরবাসীর প্রতি এক বলিষ্ঠ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাড়ি বানানোই শেষ কথা নয়। কেবল ইট, পাথরের দেয়াল তুলে নিজেকে সুরক্ষিত ভাবার অবকাশ নেই। একটি আদর্শ শহরে বসবাসের জন্য পর্যাপ্ত আলো, বাতাস, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, খেলার মাঠ এবং উন্মুক্ত জায়গার প্রয়োজন। 

রাজউক চেয়ারম্যান ভবন নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় ফাঁকা রাস্তা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সংকীর্ণ রাস্তার কারণে দমকল বাহিনী বা জরুরি চিকিৎসা সেবার যান পৌঁছাতে না পারলে বড় কোনো দুর্যোগে পুরো এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা ঢাকার অন্যতম সমস্যা। ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, যদি প্রতিটি ভবন নির্মাণে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মানা না হয় এবং রাস্তার জন্য জায়গা ছাড়া না হয়, তবে যেকোনো প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম দুর্যোগে ক্ষতির পরিমাণ হবে ভয়াবহ। রাজউক এখন কেবল ভবন অনুমোদনের সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।

সভায় উপস্থিত সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তাবৃন্দ হলেন, রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) ও সদস্য (পরিকল্পনা) সহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীলগণ। তাদের উপস্থিতিতে চেয়ারম্যান আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সকলকে সাথে নিয়েই এই শহরকে বাসযোগ্য করে তোলা হবে।

সভায় ঢাকা সমিতির সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার আদি বাসিন্দা এবং যারা এই শহরকে ভালোবাসেন, তাদের সাথে নিয়ে রাজউক একটি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। 

ঢাকা সমিতির মতো সামাজিক সংগঠনগুলো যদি সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এগিয়ে আসে, তবে রাজউকের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে।

ঢাকার সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা কেবল রাজউকের একার কাজ নয়। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের এই বক্তব্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমরা আমাদের নিজেদের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছি। বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার জন্য এখন প্রয়োজন ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সামষ্টিক কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া। ভবন নির্মাণে রাজউকের নিয়মাবলী কঠোরভাবে মেনে চলা এবং পরিবেশ রক্ষায় যত্নশীল হওয়া এখন সময়ের দাবি।

ভবিষ্যতের ঢাকার চেহারা কেমন হবে, তা নির্ভর করছে আজকের পরিকল্পনার ওপর। রাজউক চেয়ারম্যানের এই দূরদর্শী আহ্বান যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই ঢাকা আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের বুকে অন্যতম সুন্দর রাজধানী হিসেবে টিকে থাকবে। 

ইএইচ