গভর্নর

শরীয়াহ ব্যাংকিংয়ে আমূল পরিবর্তন: আসছে নতুন আইন, গঠন হচ্ছে শক্তিশালী ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
শরীয়াহ ব্যাংকিংয়ে আমূল পরিবর্তন: আসছে নতুন আইন, গঠন হচ্ছে শক্তিশালী ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’

বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী ‘ইসলামী ব্যাংকিং আইন’ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। শনিবার ১০ জানুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।

গভর্নর জানান, দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক চতুর্থাংশ শরীয়াহভিত্তিক হলেও এতদিন পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো ও তদারকির অভাবে এই খাতে নানামুখী অনিয়ম হয়েছে। সেই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই খাতকে পুনর্গঠন করতেই নতুন আইনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক ও পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশে এই খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এর জন্য কঠোর সুশাসন এবং সঠিক আইনি কাঠামো প্রয়োজন। আমরা এমন একটি আইন তৈরি করছি যা আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং ব্যাংকগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে। গভর্নর স্বীকার করেন যে, অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, তবে বর্তমান কর্তৃপক্ষ সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।

ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংস্কার হিসেবে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। গভর্নর জানান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক, এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি’ গঠন করা হয়েছে। ১ হাজার ১৪৫টিরও বেশি শাখা নিয়ে এটি দেশের বৃহত্তম নেটওয়ার্কের অধিকারী হবে এবং প্রায় ১ কোটি গ্রাহকের আমানত এই নতুন কাঠামোর অধীনে সুরক্ষিত থাকবে।

ব্যাংকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকলেও এটি পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ পেশাদার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। গভর্নর আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই বড় ইসলামী ব্যাংকটি বাজারে আসার ফলে আমানতকারীরা পুনরায় তাদের অর্থ রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত হবেন। ইতিমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রাথমিক লেনদেনে ভালো সাড়া পেয়েছে এবং কয়েক দিনেই ৪৪ কোটি টাকার নতুন আমানত সংগ্রহ করেছে।

ইসলামী ব্যাংকগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো তারল্য ব্যবস্থাপনা। প্রচলিত ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে সহজে টাকা ধার নিতে পারলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য সেই সুযোগ সীমিত। গভর্নর এই সমস্যা সমাধানে একটি শক্তিশালী ‘ইসলামী বন্ড বাজার’ বা সুকুক বাজার গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বেক্সিমকোর সুকুক বন্ডের মতো কিছু অসংগতিপূর্ণ উদ্যোগ বাজারের আস্থা নষ্ট করেছে, যা মানুষের ওপর অনেকটা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সরকার এখন নতুন সুকুক বন্ড আনার পরিকল্পনা করছে, যা ইসলামী ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট নিরসনে সহায়ক হবে।

ব্যাংক খাতে আর্থিক লুটতরাজ আর কখনই ফিরতে দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন গভর্নর। তিনি ইসলামী ব্যাংকগুলোর শরীয়াহ বোর্ডকে আরও শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদের সাহসী হতে হবে। তারা কেবল ব্যাংকের পদমর্যাদা বা চাকরির ভয় করলে চলবে না, বরং শরীয়াহ পরিপালনে কোনো বিচ্যুতি দেখলে তা সাহসের সাথে রুখে দিতে হবে। 

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা গভর্নরের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কিছু চ্যালেঞ্জের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মন্তব্য করেন যে, ব্যাংকিং খাতের উন্নতি হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ না করলে কেবল আইন দিয়ে আমূল পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের এই বক্তব্য ইসলামী ব্যাংকিং খাতের গ্রাহকদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা। নতুন আইন, ব্যাংক একীভূতকরণ এবং বন্ড বাজারের উন্নয়ন, এই তিন স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং বিশ্বমানের মডেলে পরিণত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন।

জেএইচআর