অন্তর্বর্তী সরকার কি উগ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি, দেব প্রিয় ভট্টাচার্যের তীব্র সমালোচনা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০৪:১৬ পিএম
অন্তর্বর্তী সরকার কি উগ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি, দেব প্রিয় ভট্টাচার্যের তীব্র সমালোচনা

রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। 

তিনি মন্তব্য করেছেন যে, সরকার নতুন শক্তির কথা বললেও শেষ পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র ও উগ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে সরকার নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে কি না এবং আগামীতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার গুলশানের একটি হোটেলে ‘আগামী সরকারের জন্য নির্বাচিত নীতি সুপারিশ ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। 

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সংস্কার এবং জাতীয় প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার সংস্কারের যে অঙ্গীকার করেছিল, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উন্মুক্ততা এবং অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং সরকার কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপকে গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামতকে উপেক্ষা করেছে।

নতুন শক্তি বনাম পুরোনো বন্দোবস্ত ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যারা নতুন রাষ্ট্র সংস্কারের কারিগর হতে চেয়েছিলেন, তারা শেষ পর্যন্ত পুরোনো ব্যবস্থারই অংশ হয়ে গেছেন। সরকারের কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওনারা অন্তর্বর্তী সরকার নতুন শক্তির কথা বলে শেষ বিচারে একটি ক্ষুদ্র ও উগ্র গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। যার ফলে নাগরিকদের যথাযথ সুরক্ষা প্রদান এবং নিরপেক্ষ আচরণ করতে ওনারা হিমশিম খাচ্ছেন। 

তিনি আরও বলেন, এই জিম্মি দশার কারণে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়েও সংশয় তৈরি হচ্ছে। সরকার সংস্কারের সক্ষমতা দেখাতে না পারায় এবং অংশীজনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারায় একটি জাতীয় জাগরণের সম্ভাবনা ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

আমলাতন্ত্রের পুনরুত্থান ও কায়েমি স্বার্থ সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতির দুটি নেতিবাচক ফলাফলের কথা উল্লেখ করেন ড. দেবপ্রিয়। প্রথমত, রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, তারা ব্যয়বহুল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। নির্বাচনী উচ্চ ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। 

দ্বিতীয়ত, আমলাতন্ত্রের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা আড়ালে চলে গেলেও আমলাতন্ত্র প্রবলভাবে ফিরে এসেছে। ড. দেবপ্রিয়ের মতে, পুরোনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষক হলো এই আমলাতন্ত্র, আর বর্তমান সরকারই তাদের ফিরে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দিয়েছে।

১২ দফা নীতি সুপারিশ ও প্রস্তাবিত কর্মসূচি অনুষ্ঠানে আগামী সরকারের জন্য ১২টি নীতি বিবৃতি ও একটি প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি উপস্থাপন করা হয়। এই সুপারিশগুলো তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। জাতীয় কর্মসূচির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক গবেষণা তৌফিকুল ইসলাম খান। 

এই ১২ দফা সুপারিশে মূলত সুশাসন নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, নির্বাচনী ব্যয় কমানো এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্ম মনে করে, আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের জন্য এই সুপারিশগুলো একটি পথনকশা হিসেবে কাজ করবে।

বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি সংবাদ সম্মেলনে দেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপ সদস্য রাশেদা কে চৌধূরী, সুলতানা কামাল, শাহীন আনাম, আসিফ ইব্রাহিম এবং মুশতাক রাজা চৌধুরী। বক্তারা সম্মিলিতভাবে সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং সর্বস্তরের মানুষের মতামত গ্রহণের দাবি জানান। 

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন দেশব্যাপী বিভিন্ন সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সরকারের পক্ষ থেকে এই সমালোচনার বিপরীতে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

জেএইচআর