আগুনের লেলিহান শিখায় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ, সম্পাদকদের ‘বর্বতার’ বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
আগুনের লেলিহান শিখায় গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ, সম্পাদকদের ‘বর্বতার’ বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক

একটি ভবনে আগুন দেওয়া মানে কেবল ইট পাথরের বিনাশ নয়, বরং সেই আগুনের লেলিহান শিখা যখন একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে গ্রাস করতে চায়, তখন তা হয়ে ওঠে মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। 

শনিবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত এক জরুরি গণমাধ্যম সম্মিলনে এই সত্যটিই উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। 

দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ এবং সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে এই সমাবেশের আয়োজন করে।

সম্মিলনের মূল সুর ছিল একটাই, স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার ওপর যেকোনো আঘাতকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শীর্ষ দুই গণমাধ্যম প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদকর্মীদের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই সভায়।

ক্ষোভ নয়, এ এক মধ্যযুগীয় বর্বরতা সম্মিলনে প্রধান বক্তা হিসেবে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে যা ঘটেছে, তাকে কেবল একদল মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। 

নূরুল কবীর বলেন, পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশের এই পর্যায়ে এসে আমরা যা দেখলাম, তা কেবল একটি ভবনের ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি সরাসরি মধ্যযুগীয় বর্বরতা। যখন সাংবাদিকদের ভবনের ভেতর আটকে রেখে চারদিকে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয় এবং দমকল বাহিনীকে আসতে বাধা দেওয়া হয়, তখন তার অর্থ দাঁড়ায় আপনারা তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন।

তিনি উপস্থিত সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই ধরনের সহিংসতাকে তুচ্ছ করে দেখার কোনো উপায় নেই। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং পুরো সাংবাদিকতা পেশার জন্য এক অশনিসংকেত।

আজ তাদের ওপর, কাল আপনার ওপর নূরুল কবীর তাঁর বক্তব্যে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে একতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, কোনো গণমাধ্যম যদি হামলার শিকার হয়, তবে অন্য গণমাধ্যমগুলো যদি নিরপেক্ষ থাকার দোহাই দিয়ে চুপ থাকে, তবে সেই নীরবতা একদিন তাদের নিজেদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। 

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আজ একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা হয়েছে, প্রতিবাদ না করলে কাল আপনার প্রতিষ্ঠানের ওপর হবে। পরশুদিন আরেকটির ওপর হবে। গণমাধ্যম যদি উচ্চকণ্ঠ না থাকে, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রে অপরাধের শিকড় আরও গভীরে ছড়িয়ে পড়বে। তাঁর মতে, ভিন্নমত এবং ভিন্ন কণ্ঠস্বর থাকা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ, আর এই বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখাই সাংবাদিকতার মূল ধর্ম।

গণমাধ্যম সম্মিলনে বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীনভাবে কথা বলা বা সংবাদ পরিবেশন করা কি অপরাধ হতে পারে? নূরুল কবীর দৃঢ়তার সাথে বলেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কোনোভাবেই অপরাধ হতে পারে না। বরং গণমাধ্যম যখন সাহসী ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের বিচ্যুতি ঘটে এবং জনস্বার্থ বিঘ্নিত হয়। 

সম্মিলনে উপস্থিত অন্যান্য সম্পাদক ও মালিকরা একমত হন যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করা কেবল সাংবাদিকদের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। হামলার সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং পরবর্তী তদন্ত নিয়েও সভায় প্রশ্ন তোলা হয়।

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রচারের প্রসার, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে ভীতি ও শারীরিক আক্রমণের হুমকি। নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদের এই সম্মিলন মূলত সেই ভয়কে জয় করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। 

সম্মিলনের প্রধান দাবিগুলো হলো, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সংবাদকর্মীদের কাজের উপযুক্ত এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। এছাড়া কোনো গোষ্ঠীর চাপ বা হুমকির মুখে সত্য প্রকাশ থেকে সাংবাদিকরা যাতে বিচ্যুত না হন, তার জন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সংহতি ও সংকল্প শনিবার সকাল সোয়া ১০টায় শুরু হওয়া এই সম্মিলন চলে বেলা দেড়টা পর্যন্ত। মিলনায়তন ভর্তি সাংবাদিক, সম্পাদক, কলামিস্ট এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন চত্বর আজ এক প্রতিবাদী রূপ নিয়েছিল। বক্তারা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা মানেই জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া। নূরুল কবীরের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে উঠে আসা ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ডাক সম্মেলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। 

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত বা আদর্শগত পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬ কেবল একটি বৈঠক ছিল না, এটি ছিল কলম সৈনিকদের এক ঐতিহাসিক শপথ। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে আগুনের শিখা কেবল ছাই তৈরি করেনি, বরং মুক্ত সাংবাদিকতার দাবিতে এক নতুন আগুনের জন্ম দিয়েছে যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রেরণা জোগাবে।

জেএইচআর