বাংলাদেশে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামলে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল বিরোধী মত দমনের একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় কৌশল। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেত। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা তৎকালীন শাসনব্যবস্থার এক অন্ধকার অধ্যায়কে উন্মোচিত করেছে।
শনিবার প্রকাশিত কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে বেছে বেছে টার্গেট কিলিং বা সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড ও গুম করানো হতো।
নির্বাচনের সাথে গুমের গাণিতিক সম্পর্ক কমিশনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচনের বছরের সাথে গুমের সংখ্যার একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে গুমের ঘটনা ছিল ৬১টি। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের ঠিক আগের বছর, অর্থাৎ ২০১৩ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ১২৮টিতে।
একইভাবে ২০১৮ সালের রাতের ভোট খ্যাত নির্বাচনের বছর এবং তার আগের দুই বছর গুমের ঘটনা ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ২০১৬ সালে রেকর্ড ২১৫ জন এবং ২০১৭ সালে ১৯৪ জন গুমের শিকার হন। ২০১৮ সালেও এই সংখ্যা ছিল ১৯২ জন। প্রতিবেদনের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে, বড় রাজনৈতিক সমাবেশ বা বিক্ষোভের ঠিক আগমুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা কর্মীদের তুলে নেওয়া হতো যাতে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও ঝুঁকির মাত্রা কমিশন ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে ৯৪৮ জনই সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুম হয়েছেন। রাজনৈতিক দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। গুম হওয়ার পর যারা আর কখনোই ফিরে আসেননি, তাদের মধ্যে এই দলের নেতাকর্মীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে সংখ্যার বিচারে জামায়াতে ইসলামী ও এর ছাত্র সংগঠন শিবিরের নেতাকর্মীদের হার ২২ শতাংশ। কমিশন বলছে, গুম কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত সাধারণ বিষয় ছিল না, বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া বা দীর্ঘ মেয়াদে পঙ্গু করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এটি পরিচালিত হয়েছে।
কৌশল পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপ কমাতে সরকার কৌশল পরিবর্তন করে। তারা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের পরিবর্তে গুম করার নীতি গ্রহণ করে। এতে মৃতদেহ বা রক্তের চিহ্ন না থাকায় সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দায় অস্বীকার করার সুযোগ পেত।
গুমের ঘটনার সাথে নির্দিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেতৃত্বের পরিবর্তনের একটি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে সরানো হলে গুমের সংখ্যায় কিছুটা প্রভাব পড়েছিল।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর গুমের চিরাচরিত ধরনে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। তখন সরকার গুমের পরিবর্তে মানুষকে তুলে নিয়ে কয়েকদিন নিখোঁজ রাখার পর আদালতে হাজির করার বা কারাগারে পাঠানোর পথ বেছে নেয়। কমিশনের তথ্যমতে, ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের বছর গুমের ঘটনা ছিল মাত্র ১০টি। কিন্তু ২০১৬ সালে তা সর্বোচ্চ ২১৫টিতে পৌঁছায়।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে যাচাই বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞানুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা নিখোঁজ ও মৃত ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জবাবদিহিতার দাবি ও সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি কেবল অতীতের ক্ষত উন্মোচন নয়, বরং জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করার একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘদিনের কান্না আর অপেক্ষার অবসান ঘটাতে কমিশন গুমের নির্দেশদাতা এবং সরাসরি বাস্তবায়নকারী, উভয় পক্ষকেই আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে। বিশেষ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অপব্যবহারের বিষয়টি এখন আইনি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন