আন্দোলন ও সংগ্রামের অগ্রসেনানী, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির পরিবারের আজীবন দায়িত্ব পালনের যে প্রতিশ্রুতি প্রধান উপদেষ্টা দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে বড় পদক্ষেপ নিল সরকার।
বুধবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, হাদির পরিবারকে সর্বমোট ২ কোটি টাকা প্রদান করা হচ্ছে।
অর্থ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ওসমান বিন হাদির পরিবারের জন্য দুটি ভিন্ন খাত থেকে সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একটি ফ্ল্যাট কেনার জন্য। এর পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে আলাদাভাবে ১ কোটি টাকা নগদ প্রদান করা হচ্ছে, যা দিয়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তান তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
লালমাটিয়ায় মাথা গোঁজার ঠাঁই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ গতকাল মঙ্গলবার ১ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এই টাকায় ঢাকার লালমাটিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নবনির্মিত দোয়েল টাওয়ার নামক আবাসিক ভবনে একটি ফ্ল্যাট কেনা হবে। ১ হাজার ২১৫ বর্গফুটের এই আধুনিক ফ্ল্যাটটি শহীদ হাদির স্ত্রী ও সন্তানের স্থায়ী আবাস হিসেবে ব্যবহৃত হবে। অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, হাদির স্ত্রী ও সন্তানের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার শর্তে এই অনুদান দ্রুত ছাড় করা হবে।
পল্টনের সেই রক্তাক্ত সন্ধ্যা ও শাহাদাত শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন এক নির্ভীক তরুণ নেতা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা ৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই, অর্থাৎ গত ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর পল্টন মডেল থানার বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় সন্ত্রাসীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে।
রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে জটিল অস্ত্রোপচারের পর তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে গত ১৫ ডিসেম্বর আকাশ অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রীয় শোক ও খুনিদের পলাতক থাকার তথ্য ওসমান হাদির অকাল মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর সম্মানে সরকার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, শহীদ হাদির রাষ্ট্র তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের পূর্ণ দায়িত্ব নেবে।
এদিকে হাদি হত্যা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার প্রধান আসামি ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। খুনিদের ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে কাজ করছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
পরিবারের প্রতি সরকারের অন্যান্য সহায়তা শহীদ হাদির পরিবারের পুনর্বাসনে কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও গুরুত্ব দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৫ জানুয়ারি তাঁর ভাই ওমর বিন হাদিকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রতি রাষ্ট্রের এই সম্মান ও দায়বদ্ধতা একটি ন্যায়বিচারকামী সমাজ গঠনের পথে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। শহীদ ওসমান হাদির পরিবারকে দেওয়া এই সহায়তা মূলত সেই সব ত্যাগী মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের ঋণ স্বীকারের প্রতীক, যারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন।
শহীদ হাদির স্মৃতিকে অম্লান রাখতে এবং তাঁর আদর্শকে সামনে এগিয়ে নিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা কর্মীরা ইতোমধ্যেই শোকাতুর পরিবেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এখন লালমাটিয়ার দোয়েল টাওয়ারে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের জন্য দ্রুত ফ্ল্যাট হস্তান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন