২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশে এক বিশাল রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়েছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ৫ মাস পার হলেও জননিরাপত্তার প্রশ্নে উদ্বেগ কাটেনি। বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের মতে, আগের 'ভয়ের সংস্কৃতি'র সঙ্গে এখন নতুন করে যোগ হয়েছে 'অসহিষ্ণুতা'।
শুক্রবার রাজধানীর এফডিসিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত এক ছায়া বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এমন নিবিড় পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
অধ্যাপক রওনক জাহান মনে করেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভয়ের পরিবেশটা ছিল মূলত একতরফা, যা আসত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ভয়ের ধরন বদলে গেছে। তিনি বলেন, আগে ভয় শুধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে আসত। এখন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিচিত্র সব গোষ্ঠীর দিক থেকে ভয় আসছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারছে না ভয়টা ঠিক কোথা থেকে আসছে।
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন মব জাস্টিস বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতা যেভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, তা জননিরাপত্তার জন্য এক নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে তিনি মনে করেন।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য পরমতসহিষ্ণুতার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন এই বরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। নাগরিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের একটু সহিষ্ণু হতে হবে। যদি কোনো কিছু সঠিক পথে না চলে, তবে অবশ্যই প্রশ্ন তুলতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন তোলার অর্থ এই নয় যে ভাঙচুর করতে হবে কিংবা কাউকে গিয়ে পেটাতে হবে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের মধ্যে সহনশীলতা বাড়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তুচ্ছ কারণেও সহিংসতা বা অসহিষ্ণু আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভীতি বিরাজ করছে, তা দূর করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বর্তায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। রওনক জাহানের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনও হারার মানসিকতা তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতার অর্থ হলো একটি দল হারবে এবং অপরটি জিতবে। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, যারা হেরে যান তারা নির্বাচনকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন।
এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু শব্দের নানা রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হচ্ছে, তা কেবল আমাদের কথা নয়, বরং দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতামতের ওপরও নির্ভর করবে। এটি বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দল বা মার্কার চেয়ে ব্যক্তিকে বাছাই করার ওপর জোর দেন অধ্যাপক রওনক জাহান। তবে কেবল ভোট দিয়েই নাগরিক দায়িত্ব শেষ হয় না বলে তিনি সতর্ক করেন। তার মতে, নির্বাচিত ব্যক্তিদের যদি সারাক্ষণ জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা না হয়, তবে নাগরিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপর জনগণের নজরদারি থাকতে হবে। নাগরিকেরা যদি এটা না করে, তবে তারা তাদের অধিকার হারাবে।
আসন্ন গণভোট ও সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই গণতন্ত্র সুরক্ষিত হবে শীর্ষক এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে তাদের যুক্তি তুলে ধরেন। ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা বিষয়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একমাত্র পথ।
অন্যদিকে বিইউবিটির শিক্ষার্থীরা বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা যুক্তি দেন যে, কেবল গণভোট বা নির্বাচনের মতো আনুষ্ঠানিকতা গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো যেমন পুলিশ, বিচার বিভাগ সংস্কার না হবে, ততক্ষণ যেকোনো নির্বাচনই বৃথা যাবে।
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী তার সভাপতির বক্তব্যে বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূল সোপান। তবে কালো টাকা, পেশিশক্তি এবং নির্বাচনকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
অধ্যাপক রওনক জাহানের এই বিশ্লেষণ বর্তমান বাংলাদেশের একটি আয়না হিসেবে কাজ করছে। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভয়ের বদলে এখন গোষ্ঠীগত অসহিষ্ণুতা যেভাবে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য কেবল নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন গভীর রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচন সেই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন