ইউনেস্কোর উদ্বেগের ছায়ায় বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম
ইউনেস্কোর উদ্বেগের ছায়ায় বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন

বাংলাদেশের আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যখন দেশজুড়ে সাজ সাজ রব, ঠিক তখনই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে উদ্বেগের ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর সাম্প্রতিক হামলা এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় খোদ জাতিসংঘ অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কো (UNESCO) তাদের গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে।

শনিবার সন্ধ্যায় প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সন্ত্রাসী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ‘প্রথম আলো’ কার্যালয় পরিদর্শন করে। পরিদর্শনে ইউনেস্কোর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রধান মেহেদি বেনচেলাহ যে ভয়াবহ চিত্র দেখেছেন, তাকে তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর এক 'বড় আঘাত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

মেহেদি বেনচেলাহ যখন কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর পুড়ে যাওয়া ও লুট হওয়া ভবনটি ঘুরে দেখছিলেন, তখন তাঁর চেহারায় ফুটে ওঠে বিস্ময় ও উদ্বেগ। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতের সেই নারকীয় হামলায় প্রথম আলোর ২৭ বছরের ঐতিহ্য যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে, তা কেবল একটি ভবনে আগুন নয়, বরং মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের এক অশুভ চেষ্টা হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ প্রতিনিধিদলকে জানান, সেই হামলার পরদিন দীর্ঘ ২৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পত্রিকার ছাপা ও অনলাইন উভয় সংস্করণই বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল কর্তৃপক্ষ। এটি কেবল একটি সংবাদপত্রের ক্ষতি নয়, বরং তথ্যের অবাধ প্রবাহে এক বিরাট অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। কিন্তু নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের ওপর এই ধরনের আক্রমণ মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি বা ট্রমা সৃষ্টি করেছে।

ইউনেস্কোর প্রতিনিধি মেহেদি বেনচেলাহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সাথে বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন মাঠে কাজ করার সময় সাংবাদিকেরা বর্তমানে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন? জবাবে জানানো হয় যে, কিছু ঝুঁকি থাকলেও দেশের সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে সরকার এখন অনেকটা সতর্ক। তবে নির্বাচনের দিন এবং তার পরবর্তী সময়ে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হামলার শিকার গণমাধ্যমগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে যে, তারা কেবল উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় তারা বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে।

মেহেদি বেনচেলাহ বলেন, "গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ হলো অবাধ তথ্যপ্রবাহ। আর সেই তথ্যপ্রবাহ সচল রাখার মূল কারিগর সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ইউনেস্কো সবসময় বাংলাদেশের সাহসী সাংবাদিকদের পাশে থাকবে।"

বৈঠকে আলোচিত একটি প্রধান দিক ছিল হামলার পর সাংবাদিক সমাজের অভূতপূর্ব ঐক্য। প্রথম আলোর ওপর হামলার প্রতিবাদে যেভাবে দেশের বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করেছে এবং সরকারের উপদেষ্টাসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা সংহতি জানিয়েছেন, তা এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। এই ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধই হয়তো ভবিষ্যতে সংবাদপত্রের ওপর আরও বড় সহিংসতা রোধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো গণমাধ্যমের অবাধ বিচরণ। কিন্তু সাংবাদিকরা যদি ভয়ের সংস্কৃতির (Culture of Fear) মধ্যে কাজ করেন, তবে নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষ আসবে না। ইউনেস্কোর এই সফর ও উদ্বেগ আসলে বাংলাদেশ সরকারকে একটি শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে নির্বাচনের সফলতার মাপকাঠি কেবল ভোটের সংখ্যায় নয়, বরং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও নির্ভর করছে।

সিইসি যখন ‘নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা’র কথা বলছেন, তখন সেই নিরাপত্তাবলয়ে সংবাদকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। নির্বাচনী মাঠে সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ কেবল একটি ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, এটি পুরো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আঘাত।

১৮ ডিসেম্বরের সেই আগুনের লেলিহান শিখা প্রথম আলোর ভবন পুড়িয়ে দিলেও সাংবাদিকদের কলমকে থামিয়ে দিতে পারেনি। তবে ইউনেস্কোর এই উদ্বেগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের যাত্রা এখনো বন্ধুর। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কেবল বুলি নয়, বরং বাস্তব কর্মতৎপরতায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ইউনেস্কোর এই সমর্থন কেবল সহমর্মিতা নয়, এটি বিশ্ববাসীর এক কড়া সতর্কবার্তা বাংলাদেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন আন্তর্জাতিক বিশ্বের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

এএন