রওনক জাহান

সীমার দোহাই দিয়ে মেয়েদের স্বপ্ন থামানো হচ্ছে

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ০৩:১২ পিএম
সীমার দোহাই দিয়ে মেয়েদের স্বপ্ন থামানো হচ্ছে

বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কালজয়ী রচনা সুলতানার স্বপ্ন আজও নারী অগ্রযাত্রার পথে সমান প্রাসঙ্গিক। এই গ্রন্থের মূল সুরকে ধারণ করে আজ শনিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেশের বরেণ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেছেন কমা অল্প বয়সী মেয়েদের আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে দমিয়ে রাখার জন্য আজও একটি প্রাচীন অজুহাত ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় কমা আর তা হলো সীমা। মেয়েদের বলা হয় কমা তারা সব করতে পারবে ঠিকই কমা কিন্তু তাদের একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি বা সীমার মধ্যে থাকতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত সুলতানার স্বপ্ন কমা শিক্ষার্থীসম্পৃক্ত সৃজনশীল পাঠ শীর্ষক গ্রন্থপাঠ উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন কমা গত ৭০ বছরে অবকাঠামো ও প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি হলেও নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মূলে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন কমা সাত দশক আগে আমার ছোটবেলায় আমাকে যা শুনতে হতো কমা আজকের আধুনিক যুগেও মেয়েদের সেই একই বয়ান শুনতে হচ্ছে।

আজও বলা হয় কমা ছেলেরা সব করতে পারবে কমা কিন্তু মেয়েদের ঘরের ভেতরে থাকা বা সীমার মধ্যে চলা ভালো। এই মানসিকতা আসলে নারীর সক্ষমতাকে অস্বীকার করার একটি অপকৌশল মাত্র। 

সুলতানার স্বপ্ন বইটির বিশেষত্বের কথা উল্লেখ করে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শিক্ষার্থীদের জানান কমা বেগম রোকেয়া এই গ্রন্থে অত্যন্ত রসাত্মক ঢঙে দেখিয়েছেন যে নারী ও পুরুষের প্রচলিত সামাজিক ভূমিকাগুলোকে চাইলেই বদলে দেওয়া সম্ভব।

রওনক জাহান বলেন কমা এই বইটিতে দেখানো হয়েছে কমা মেধা কমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীরাও যুদ্ধ পরিচালনা করতে সক্ষম। অর্থাৎ পৃথিবী শাসনের জন্য কেবল শারীরিক শক্তির বা বাহুবলের প্রয়োজন নেই কমা বরং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাই আসল শক্তি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত এই ব্যতিক্রমী উৎসবে রাজধানীর ৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। 

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে অধ্যাপক রওনক জাহানের বোন রওশন জাহান সম্পাদিত এবং ১৯৮৮ সালে আমেরিকার ফেমিনিস্ট প্রেস থেকে প্রকাশিত সুলতানার স্বপ্ন গ্রন্থের একটি ঐতিহাসিক কপি জাদুঘর কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা হয়।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনেসকোর বিশেষ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ এবং এভারেস্ট জয়ী প্রথম বাংলাদেশি নারী নিশাত মজুমদার। নিশাত মজুমদার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে সকল বাধা অতিক্রম করার আহ্বান জানান। 

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্য সচিব মফিদুল হক অনুষ্ঠানে আগত শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ জানান এবং সৃজনশীল পাঠের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা দেন।

মেয়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত সীমা অতিক্রম করে বড় স্বপ্ন দেখার আহ্বান জানানোই ছিল এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। ৭০ বছর আগের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আজও নারীদের বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বলে বক্তারা উপলব্ধি প্রকাশ করেন। 

বেগম রোকেয়ার নারীস্থান বা সুলতানার স্বপ্ন থেকে বিজ্ঞান ও যুক্তির শিক্ষা গ্রহণ করা এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে কালজয়ী সাহিত্যের সৃজনশীল পাঠ ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অধ্যাপক রওনক জাহানের এই বক্তব্য আধুনিক যুগেও নারী স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ রূপ নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পাঠের মাধ্যমে রোকেয়ার স্বপ্নগুলো হৃদয়ে ধারণ করতে পারলেই একটি সাম্যবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠন সম্ভব বলে মনে করছেন আয়োজকরা।

জেএইচআর