ত্রয়োদশ নির্বাচনে ইইউ-র ‘মেগা’ মিশন ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
ত্রয়োদশ নির্বাচনে ইইউ-র ‘মেগা’ মিশন ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিগত নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব তুলে ধরে পর্যবেক্ষণ থেকে সরে দাঁড়ালেও, এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন সক্রিয়তা দেখাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। 

২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠিয়েছে সংস্থাটি, যা কেবল শহরের কেন্দ্রগুলোতে নয়, বরং ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠালেও এবার ইইউ-র এই বিপুল আগ্রহের পেছনে কাজ করছে ‘ঐতিহাসিক পরিবর্তনের’ আকাঙ্ক্ষা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও মিশন প্রধান ইভারস আইজাবস-এর নেতৃত্বে এই মিশনে অংশ নিচ্ছেন প্রায় ২০০ জন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষক।

তৃণমূল সফর: গত ১৭ জানুয়ারি থেকে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষক (LTO) মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর স্থানীয় কোন্দল, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা যাচাই করছেন।

সামগ্রিক মূল্যায়ন: কেবল ভোটের দিন নয়, বরং নির্বাচনের আইনি কাঠামো, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ পর্যবেক্ষণ করছে এই মিশন।

আর্থিক সহায়তা: বাংলাদেশের নির্বাচন যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হয়, সেজন্য ইইউ ৪ মিলিয়ন ইউরোর বেশি একটি বিশেষ সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।

ইইউ-র এই অতি-সক্রিয়তাকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের ওপর একটি নৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, যা কারচুপি রোধে সহায়ক হতে পারে।

আস্থার সংকট দূরীকরণ: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত কয়েকটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর ইইউ-র পূর্ণাঙ্গ উপস্থিতি ভোটারদের মনে কিছুটা হলেও আস্থার সঞ্চার করছে।

হস্তক্ষেপ বনাম পর্যবেক্ষণ: সমালোচকরা বলছেন, পর্যবেক্ষকদের কাজ হওয়া উচিত কেবল পর্যবেক্ষণ, হস্তক্ষেপ নয়। তবে বিশ্লেষক দ্বীন মোহাম্মাদ সাব্বির মনে করেন, "জনগণ যদি সচেতন থাকে এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা নিজেদের দায়িত্ব সততার সাথে পালন করেন, তবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাই ফলাফল প্রভাবিত করতে পারবে না।"

ব্যারোমিটার হিসেবে ইইউ: ২০২৬-এর এই ভোটকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার 'টেস্ট কেস' হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইইউ-র রিপোর্ট পরবর্তীতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জিএসপি (GSP) সুবিধার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ইইউ ইলেকশন অবজারভেশন মিশন জানিয়েছে, তাদের প্রিলিমিনারি রিপোর্ট বা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ফলাফল ভোটের দুদিন পর অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আশা করছে, বিদেশি এই ‘ওয়াচডগ’দের উপস্থিতি ভোট উৎসবকে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সহায়ক হবে।

২০০৮ থেকে ২০২৪—দীর্ঘ দেড় দশকের নির্বাচনী বিতর্ক কাটিয়ে ২০২৬-এর এই নির্বাচনে ইইউ-র সক্রিয়তা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি গড়ে তোলার একটি সুযোগ। তবে চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করছে সাধারণ ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সাবলীল পরিবেশের ওপর।

এএন