চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের মুখোমুখি নৌ উপদেষ্টা, ওয়ান টু ওয়ান কথা বলার আশ্বাস

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম
চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের মুখোমুখি নৌ উপদেষ্টা, ওয়ান টু ওয়ান কথা বলার আশ্বাস

২০২৬ দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দরে গত তিন দিন ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষ আজ এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে। বন্দরের অচলাবস্থা নিরসনে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে খোদ নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন শ্রমিকদের তীব্র বিক্ষোভ ও তোপের মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, নিরাপত্তার বেষ্টনী পেরিয়ে উপদেষ্টা নিজের গাড়ি থেকে নেমে সরাসরি উত্তেজিত শ্রমিকদের মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে বাধ্য হন।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক ভবনের সামনে তখন শত শত শ্রমিকের ভিড়। হাতে প্ল্যাকার্ড আর মুখে স্লোগান—বন্দরে বিরাজ করছিল এক থমথমে উত্তেজনা। ঠিক সেই মুহূর্তে নৌ উপদেষ্টার গাড়ি বহর বন্দর ভবনের ফটকের সামনে পৌঁছালে আন্দোলনকারীরা পথ আগলে দাঁড়ান।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ খুঁজতেই হয়তো উপদেষ্টা গাড়ি থেকে নেমে আসেন। এ সময় ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানার তলে আন্দোলনকারীরা বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের অপসারণ চেয়ে আকাশ-বাতাস কাঁপানো স্লোগান দিতে থাকেন।

উপদেষ্টা গাড়ি থেকে নামার পর আন্দোলনকারীদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন সরাসরি তার কাছে অভিযোগের ঝুলি খুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্যার, ৩২ বছর ধরে এই বন্দরে রক্ত-ঘাম দিচ্ছি। কিন্তু গত দেড় বছরে আমরা যে ধরনের হয়রানি আর অবজ্ঞার শিকার হয়েছি, তা নজিরবিহীন। চেয়ারম্যান সাহেব আমাদের সাথে দেখাই করেন না। আমাদের কোনো দাবি কানে তোলেন না। আমরা এই চেয়ারম্যানের অপসারণ ছাড়া কোনো পথ দেখছি না।

শ্রমিকদের দাবি, বন্দরের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে ব্যাপক বৈষম্য এবং শ্রমিক স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে তারা আজ রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

উত্তেজিত শ্রমিকদের শান্ত করতে এম সাখাওয়াত হোসেন অত্যন্ত ধৈর্য ও কৌশলের পরিচয় দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, শ্রমিকদের কথা শোনার সময় সেখানে অভিযুক্ত কোনো পক্ষ উপস্থিত থাকবে না। উপদেষ্টা বলেন, “আমি আপনাদের দাবিগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনব। আপনাদের সাথে আমার ওয়ান টু ওয়ান (একান্তে) কথা হবে, সেখানে চেয়ারম্যান থাকবেন না। তবে মনে রাখবেন, আমি আপনাদের কথা যেমন শুনব, আপনাদেরও আমার কথা শুনতে হবে।

উপদেষ্টার এই আশ্বাসে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হয় এবং তিনি বৈঠকস্থলে প্রবেশ করেন। তবে দুপুর সাড়ে ১২টায় বন্দর ব্যবহারকারীদের সাথে বৈঠক শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আবারও তাকে শ্রমিকদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়।

আজ ছিল শ্রমিকদের লাগাতার কর্মবিরতির তৃতীয় দিন। উপদেষ্টার সফর ও আলোচনার আশ্বাসের পরেও বন্দরের কার্যক্রমে কোনো গতি ফেরেনি। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বন্দর দিয়ে কোনো কনটেইনার বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। বন্দর চত্বরে জমে থাকা হাজার হাজার টন আমদানি পণ্য ডেলিভারি বন্ধ রয়েছে। বহির্নোঙরে জাহাজের সারি বাড়ছে, যা দেশের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, গত দেড় বছরে বন্দরের ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে বর্তমান চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক কিছু সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। নৌ উপদেষ্টা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও শ্রমিকরা তাদের এক দফা দাবি—অর্থাৎ ‘চেয়ারম্যানের অপসারণ’-এ অনড় রয়েছেন।

বন্দরে তিন দিনের এই অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা। তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল সময়মতো খালাস না হওয়ায় অনেক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান দাবি করেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব এবং শ্রমিক অসন্তোষ কেবল বন্দরের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সাথেও জড়িত। নৌ উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন শ্রমিকদের সাথে আলাদাভাবে বসার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে বন্দরের চাকা আবার কখন ঘুরবে। শ্রমিকরা যদি তাদের দাবিতে অনড় থাকে এবং প্রশাসনে পরিবর্তন না আসে, তবে এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এএন