চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু, পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা

চট্টগ্রাম ব্যুরো  প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু, পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা

সকাল ৮টা বাজার সাথে সাথেই এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যস্ততম নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি)। ক্রেনের গর্জন আর লরি-ট্রেলারের ব্যস্ততা ছাপিয়ে সেখানে এখন কেবলই শ্রমিক-কর্মচারীদের স্লোগান। দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'কে এই টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে নেমেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক সংগঠনগুলো।

মূলত এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই এই আন্দোলনের সূত্রপাত। শ্রমিক নেতাদের দাবি, দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ বিদেশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে? এর আগে ছয় দিনের কর্মবিরতি পালন করলেও নৌ পরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাসে তারা কাজে ফিরেছিলেন। কিন্তু দাবি পূরণে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আজ থেকে তারা আবারও চূড়ান্ত আন্দোলনে নেমেছেন।

শ্রমিকদের প্রধান ৪ দফা দাবি হলো-

১. এনসিটি ইজারা বাতিল: ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করা।
২. চেয়ারম্যানের অপসারণ: বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য বন্দর চেয়ারম্যানকে দায়ী করে তাঁর প্রত্যাহার।
৩. শাস্তি প্রত্যাহার: আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে নেওয়া সব প্রশাসনিক ব্যবস্থা বাতিল করা।
৪. নিরাপত্তা নিশ্চিত: কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার লিখিত গ্যারান্টি।

টানা কয়েক দিনের অস্থিরতা এবং আজকের ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনাল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ এক চিত্র:

বহির্নোঙরে ভিড় বাড়ছে মাদার ভেসেলের। জেটিতে কন্টেইনার লোড-আনলোড না হওয়ায় জাহাজগুলোকে সাগরে অলস বসে থাকতে হচ্ছে।

ইয়ার্ডে কন্টেইনারের পাহাড় জমেছে। আমদানিকারকরা সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিনের ধর্মঘটে বন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি শত শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা।

ধর্মঘট শুরুর পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বন্দর এলাকা। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বানচাল করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়েছে। বন্দর রক্ষা পরিষদের এক নেতা বলেন, দমন-পীড়ন করে শ্রমিকদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। আমাদের পেটে লাথি দিয়ে বিদেশি কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়া হবে, তা মেনে নেওয়া হবে না।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, জেটির ভেতরে অপারেশনাল কোনো ক্রেন চলছে না। এমনকি বন্দর থেকে পণ্যবাহী লরি বের হতে বা ঢুকতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমঝোতার কথা বলা হলেও শ্রমিকরা এবার 'চূড়ান্ত ফয়সালা' না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের লাইফলাইন। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বিরোধ এখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুতই বন্দরে প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসবে।

এএন