ফরমালি বিদায় নিয়ে দেশ ত্যাগ করলেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৯:৩১ পিএম
ফরমালি বিদায় নিয়ে দেশ ত্যাগ করলেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব

বাংলাদেশ যখন একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক সেই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেশত্যাগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। 

শনিবার সকালে তিনি এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে জার্মানির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করার পর থেকেই তাঁর প্রস্থান নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। তবে এই সব জল্পনার অবসান ঘটিয়েছেন তিনি নিজেই। মাঝরাতে ফেসবুকে এক দীর্ঘ ও আবেগঘন স্ট্যাটাসে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার এই বিশেষ সহকারী।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের সেই স্ট্যাটাসজুড়ে ছিল যেমন অর্জনের তৃপ্তি, তেমনি ছিল কিছু মানুষের আচরণে তীব্র অভিমান এবং এক বছরের কর্মজীবনের আর্থিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান।

অনেকেই ফয়েজ তৈয়্যবের চলে যাওয়াকে ‘গোপন প্রস্থান’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তিনি তাঁর পোস্টে স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়েই বিদায় নিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ফেব্রুয়ারির ৮, ৯ ও ১০ তারিখে তিনি আইসিটি বিভাগ, পিটিডি (ডাক ও টেলিযোগাযোগ) এবং বিটিআরসি থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিয়েছেন।

১০ ফেব্রুয়ারি ছিল তাঁর অফিশিয়ালি শেষ কর্মদিবস। সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, সহকর্মীরা তাঁকে গান গেয়ে বিদায় জানিয়েছেন এবং সেদিন সবার সাথে একটি ‘ফেয়ারওয়েল ডিনার’ বা বিদায়ী নৈশভোজেও অংশ নিয়েছেন তিনি। নির্বাচনের আগমুহূর্তে প্রযুক্তি-নির্ভর নির্বাচনী আয়োজনে তাঁর সক্রিয় কন্ট্রিবিউশন ছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের স্ট্যাটাসে সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি। তিনি লিখেছেন, দেশের জন্য কাজ করতে এসে ফিন্যান্সিয়ালি অনেক লোকসান হয়েছে। সেভিংস যা ছিল সব শেষ হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানকে ডিপ্রাইভ করে (বঞ্চিত করে), নিরাপদ জীবন ফেলে দেশে এসেছিলাম।

তিনি আরও জানান, এখন প্রবাসে ফিরে গিয়ে দ্রুত তাঁকে একটি চাকরি খুঁজতে হবে। সততা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তিনি অটল ছিলেন দাবি করে বলেন, একজন সৎ মানুষকে অপবাদ দেওয়ার আগে তথ্য যাচাই করা উচিত।

দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি পরিবারের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, তাঁর ছেলের স্কুলে ‘প্যারেন্টস মিটিং’ আছে এবং তাঁর স্ত্রীর একটি ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ তৈরি হয়েছে। এই পারিবারিক কারণেই তিনি যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে ছুটি নিয়ে পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন। 

সমালোচকদের উদ্দেশ্যে তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, তিনি রিটার্ন টিকিট কেটেই গিয়েছেন এবং চাইলে সেই তারিখ যে কেউ জেনে নিতে পারেন। কাকতালীয়ভাবে তাঁর যাত্রার দিনটি ছিল ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’, যা তিনি তাঁর পরিবারকে উৎসর্গ করতে চান।

টেলিযোগাযোগ খাতের সংস্কার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফয়েজ তৈয়্যব লিখেছেন, তিনি একটি শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রণালয়ে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করেছেন। ৫ বছরের কাজ তিনি মাত্র ১ বছরে শেষ করার জন্য ‘পাগলের মতো’ খেটেছেন। নতুন প্রযুক্তি ও পলিসি পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি ডিজিটাল অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করেছেন।

দুর্নীতির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলতে পারি, আমি ১ টাকাও দুর্নীতি করিনি। আমি বাই ভার্চু সৎ লোক। টাকা মেরেছি এই অপবাদ নিতে পারছি না। মোবাইল ব্যবসায়ী ও টেলিকম মাফিয়ারা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছে কারণ আমি তাদের কাছে মাথা নত করিনি।

ফয়েজ তৈয়্যব তাঁর দীর্ঘ স্ট্যাটাসের শেষে এক গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মাঝেমধ্যে মনে হয় দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ সৎ এবং জ্ঞান-ভিত্তিক নেতৃত্ব (Knowledge Driven Leadership) প্রাপ্য নয়। এই উপলব্ধি তাঁকে মানসিকভাবে তীব্র আঘাত করেছে।

বিগত এক বছর দায়িত্ব পালনের চাপে তাঁর ঘুমের চক্র (Sleeping Cycle) তছনছ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। এখন বিশ্রামের পাশাপাশি উপহার পাওয়া বইগুলো পড়ে এবং নিজের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে কিছুটা শান্তি খুঁজবেন তিনি।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বুয়েট থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর প্রবাসে প্রকৌশলী ও নীতি বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করছিলেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আইসিটি পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর কাজের দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ সরকার তাঁকে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়।

অল্প সময়ের এই পথচলায় তিনি যেমন প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি নীতিগত কঠোরতার কারণে প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজনও হয়েছেন। তাঁর এই প্রস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষলগ্নে একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

এএন