তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন: কেমন হচ্ছে তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভা?

বিশেষ প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন: কেমন হচ্ছে তারেক রহমানের নতুন মন্ত্রিসভা?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর এখন সবার নজর বঙ্গভবন ও বিএনপির নীতি-নির্ধারণী মহলের দিকে। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়। তবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কৌতূহল—কেমন হচ্ছে তারেক রহমানের ‘স্বপ্নের মন্ত্রিসভা’?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সূর্যোদয়। ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। দলীয় প্রধান তারেক রহমানের কাঁধে এখন রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুভার। তবে একা নন, একটি দক্ষ ও আধুনিক ‘টিম’ নিয়ে তিনি দেশ গড়ার মিশনে নামতে চান। দলীয় অন্দরমহলের গুঞ্জন এবং দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, এবারের মন্ত্রিসভায় থাকছে বড় ধরনের চমক। পদের মোহ নয়, বরং কাজের দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়েই সাজানো হচ্ছে আগামীর সরকার।

তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প দেখছে না বিএনপি। বিশেষ করে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং প্রশাসনের জটিল মারপ্যাঁচ সামলাতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপরই ভরসা রাখা হচ্ছে। 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: দলের মহাসচিব এবং রাজপথের লড়াইয়ের প্রধান সেনাপতি হিসেবে তাঁর স্থান মন্ত্রিসভায় অবধারিত বলেই মনে করা হচ্ছে।

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ: সামরিক অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বৈদেশিক সম্পর্ক এবং বাণিজ্য ইস্যুতে তাঁর দক্ষতা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, ফলে পররাষ্ট্র বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তাঁর নাম জোরালোভাবে আলোচনায় আছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ ও ড. আবদুল মঈন খান: প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই দুই নেতাকেও রাখা হচ্ছে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে।

সেলিমা রহমান ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: দলের স্থায়ী কমিটির এই দুই সদস্যও নতুন মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খানের নাম নিয়ে আলাদা গুঞ্জন রয়েছে। দলের একটি বড় অংশ মনে করছে, তাঁকে মন্ত্রিসভায় না রেখে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় তাঁর ভূমিকা এবং দলের দুর্দিনে তাঁর বিশ্বস্ততা তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নির্বাচনের আগে বিএনপি একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যেতে পারে এই মন্ত্রিসভায়।

জোনায়েদ সাকি ও আন্দালিভ রহমান পার্থ: গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি এবং বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ এই দুই তরুণ ও তুখোড় বক্তাকে মন্ত্রিসভায় রেখে তারেক রহমান এক আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারের বার্তা দিতে চান।

শাহাদাত হোসেন সেলিম ও ববি হাজ্জাজ: ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী এই দুই নেতার নামও সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকায় রয়েছে।

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এবার কেবল রাজনীতিক নয়, বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদেরও সরকারে যুক্ত করা হবে।

বিশ্বব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বৈশ্বিক নেতাদের মন্ত্রিসভায় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা আছে—এমন একজন বিশেষজ্ঞকেও নতুন মন্ত্রিসভায় দেখা যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত সচিবের নাম ভাবা হচ্ছে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নীতি-গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।

এবারের মন্ত্রিসভায় অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন তরুণ মুখ ঠাঁই পেতে পারেন। পঞ্চগড় থেকে চট্টগ্রাম, কিংবা সিলেট থেকে ঝিনাইদহ—পুরো বাংলাদেশের ভৌগোলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাচ্ছে বিএনপি। এছাড়া নারী নেতৃত্ব ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মানিকগঞ্জ, সিলেট ও পার্বত্য অঞ্চলের একাধিক সংসদ সদস্যের নাম তালিকায় রয়েছে। চিকিৎসকদের নেতা হিসেবে পরিচিত এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং সফল উদ্যোক্তা আবদুল আউয়াল মিন্টুও থাকতে পারেন নতুন এই মিশনে।

সূত্রগুলো বলছে, মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা খুব বেশি বড় না করে বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) পরিধি বাড়ানো হবে। সেখানে বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা এবং বিশেষ সহকারীদের একটি শক্তিশালী প্যানেল থাকবে, যারা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন পলিসি তৈরিতে সহায়তা করবেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'নতুন মন্ত্রিসভা কেমন হতে যাচ্ছে, তা দেখতে দেশবাসীকে আর অল্প সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে এই সরকারে।

সব মিলিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথ অনুষ্ঠানের পর যখন নতুন মন্ত্রীদের নাম ঘোষিত হবে, তখন তাতে একদিকে যেমন থাকবে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে থাকবে তরুণদের সৃজনশীলতা। তারেক রহমান সম্ভবত এমন এক মন্ত্রিসভা উপহার দিতে যাচ্ছেন, যা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি ‘টেকনোক্র্যাট-পলিটিক্যাল’ মিশ্রণের সরকার হিসেবে পরিচিতি পাবে।

এএন