ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধুলোবালি থিতিয়ে আসার পর এখন সামনে আসছে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আমলনামা। দেশের শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি তাদের সর্বশেষ বিশ্লেষণে এই তথ্য দেখিয়েছে।
এবারের সংসদ কোনো সাধারণ কক্ষ নয়, বরং এটি আক্ষরিক অর্থেই ধনাঢ্যদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী ২৯৯ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ২৩৬ জনই কোটিপতি, যা মোট সদস্যের প্রায় ৭৯ শতাংশ।
এর চেয়েও বড় চমক হলো, এদের মধ্যে ১৩ জন সদস্যের সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকার বেশি। সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলফনামা বিশ্লেষণ ও বিজয়ীদের প্রোফাইল শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের সংসদে বিত্তশালীদের আধিপত্য গত যেকোনো সময়ের রেকর্ডকে চ্যালেঞ্জ করছে।
হলফনামায় দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি জানায়, নির্বাচিত ২৩৬ জন সদস্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১ কোটি টাকার উপরে। মাত্র ১৩ জন সদস্যের মোট সম্পদের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এদের মধ্যে অধিকাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী ঘরানার। টিআইবি বলছে, রাজনীতি এখন মূলত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সংসদ সদস্যদের আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবসায়িক লভ্যাংশ এবং বিনিয়োগ শীর্ষে রয়েছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন সংসদে অভিজ্ঞ ও প্রবীণদের সংখ্যাই বেশি। তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার স্লোগান থাকলেও পরিসংখ্যান ভিন্ন কথা বলছে। জয়ী সংসদ সদস্যদের গড় বয়স দাঁড়িয়েছে ৫৯ বছর।
পঁচিশ থেকে চৌত্রিশ বছর বয়সী সদস্য মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং পঁয়ত্রিশ থেকে চুয়াল্লিশ বছর বয়সী সদস্য ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে পঁয়তাল্লিশ থেকে চুয়ান্ন বছর বয়সী সদস্য ১৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
পঞ্চান্ন থেকে চৌষট্টি বছর বয়সী সদস্য ৩৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং পঁয়ষট্টি বছরের বেশি বয়সী সদস্য ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, পঁয়ষট্টি বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ নেতারাই সংসদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি স্থান দখল করে আছেন।
সংসদে বয়সের ভার থাকলেও অভিজ্ঞতার দিক থেকে এবার এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। এবারের নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক ২০৯ জন প্রথমবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ সদস্যই আইনসভায় নতুন মুখ। সবচেয়ে বড় চমক হলো, নবনির্বাচিত সংসদের সম্ভাব্য সংসদ নেতা এবং বিরোধী দলীয় নেতা, উভয়ই প্রথমবার সংসদে যাচ্ছেন।
এটি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকদের আধিপত্য সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্বকে সংকুচিত করতে পারে।
নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া হলফনামায় সম্পদের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম হওয়ার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি।
সংস্থাটি আরও জানায়, যারা প্রথমবারের মতো সংসদে আসছেন, তাঁদের ওপর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। বিশেষ করে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই নতুন ও সম্পদশালী সদস্যরা কতটুকু স্বচ্ছ থাকবেন, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একাধারে তারুণ্যের অভাব এবং অভিজ্ঞতাহীন নতুন মুখের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। বিপুল সম্পদের মালিক এই সাংসদদের নেতৃত্বে দেশ সংস্কারের পথে কতটুকু এগোবে, তা সময়ই বলে দেবে।
টিআইবির এই তথ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে টাকা এবং ক্ষমতার নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ২৯৯টি আসনের ফলাফল অনুযায়ী এই বিশ্লেষণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন