দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতি নির্মূলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নবনিযুক্ত ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু। শুক্রবার সকালে নিজ শহর রাজশাহীতে পা রেখেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে ভূমি মন্ত্রণালয়কে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজশাহী সার্কিট হাউসে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভূমিমন্ত্রী বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।
আমি সাফ জানিয়ে দিতে চাই, এই মন্ত্রণালয়ে কোনো ধরনের অন্যায় বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে যাতে জনগণকে আর হয়রানির শিকার হতে না হয়। তিনি আরও যোগ করেন, ভূমি মন্ত্রণালয় নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কিছু সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন রয়েছে। ইতিপূর্বে প্রশাসনিক কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি যা শিখেছেন, এখন মন্ত্রণালয়ের বৃহৎ পরিসরে তা কাজে লাগিয়ে জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে উৎসর্গ করতে চান।
সাংবাদিকদের সাথে আলাপ শেষে মন্ত্রী রাজশাহী বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সভায় রাজশাহীর ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা, বিশেষ করে চরাঞ্চলের জমি বিরোধ, খাস জমি বণ্টন এবং ই-নামজারি প্রক্রিয়ার বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মন্ত্রী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ভূমি অফিসের সেবা নিতে এসে কোনো নাগরিক যেন ফিরে না যায়। ডিজিটালাইজেশনের সুফল যেন প্রান্তিক কৃষক ও সাধারণ মানুষ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি খাতের কর্মকর্তাদের নৈতিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
মতবিনিময় সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী ৩ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল হক মিলন। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান এবং জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানগণ। সভায় বিভাগের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়।
ভূমিমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন এবং ভূমি রেকর্ড ও সেবা পুরোপুরি অনলাইন নির্ভর করার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রকৃত ভূমিহীনদের মধ্যে স্বচ্ছতার সাথে খাস জমি বণ্টন এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা তাঁর প্রধান লক্ষ্য বলে জানান।
বাংলাদেশে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ফৌজদারি অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ। নবনির্বাচিত সরকারের এই হেভিওয়েট মন্ত্রীর রাজশাহী থেকে দেওয়া এই ঘোষণা মূলত সারা দেশের ভূমি কর্মকর্তাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে চরের জমি নিয়ে যে দীর্ঘস্থায়ী বিবাদ রয়েছে, তা নিরসনে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত তদারকি নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। মন্ত্রী মিনু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি কেবল ডেস্কে বসে ফাইল সই করবেন না, বরং ঝটিকা সফরের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোর প্রকৃত চিত্র সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবেন। তাঁর এই শেখা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি ভূমি প্রশাসনে কতটুকু পরিবর্তন আনে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
রাজশাহীর কৃতি সন্তান হিসেবে মিজানুর রহমান মিনুর ওপর স্থানীয়দের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো একটি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং দপ্তরে তিনি কীভাবে আমূল পরিবর্তন আনেন, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়। তবে প্রথম দিনেই তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং অনিয়ম সহ্য না করার অঙ্গীকার সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন