আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে, যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ফুটে উঠেছে রক্তস্নাত ২১শে ফেব্রুয়ারি, তখন সমগ্র জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নত করছে সেইসব সূর্যসন্তানদের চরণে, যাঁরা ভাষার মান বাঁচাতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রাজপথে। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার পিচঢালা পথে যে আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়েছিল, তার লাভা আজও আমাদের ধমনীতে বইছে।
২১ আমাদের চেতনা, ২১ আমাদের অহংকার। ২১ মানে মাথা নত না করা এক সুউচ্চ হিমালয়। ১৯৫২ সালের এই দিনে যে অগ্নিঝরা দুপুরের সাক্ষী হয়েছিল তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান, তার রেশ আজ বিশ্বজুড়ে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু এই স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে একদল দামাল ছেলের নিথর দেহ, স্বজন হারানো আর্তনাদ এবং তপ্ত বুলেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর অকুতোভয় ইতিহাস। রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর ও সালামের রক্তে রঞ্জিত সেই রাজপথ আজ কেবল ইতিহাস নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিনাশী দলিল।
১৯৪৮ সালে যখন ঘোষণা দেওয়া হলো ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’, তখন থেকেই রোপিত হয়েছিল বিদ্রোহের বীজ। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সেই বিদ্রোহ রূপ নেয় এক গণবিস্ফোরণে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যখন মিছিল বের হলো, তখন পাকিস্তানি শোষকদের তপ্ত বুলেট কেড়ে নিল আমাদের ভাইদের প্রাণ।
জব্বার, বক্কর, রফিকের সেই নিথর দেহগুলো যখন রাজপথে লুটিয়ে পড়ল, তখন কেবল মানুষ মরেনি, বরং জন্ম নিয়েছিল এক অপরাজেয় শক্তি। ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার এমন নজির বিশ্বের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। তারা জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন মায়ের ভাষার চেয়ে প্রিয় আর কিছু হতে পারে না। সেই রক্তের দাগ কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়; সেই ত্যাগের মহিমা কোনোদিন ম্লান হওয়ার নয়।
আজকের আধুনিক বাংলাদেশে, যখন আমরা ২০২৬ সালের দাঁড়িয়ে নতুন এক সময়ের কথা বলছি, তখন আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্রদের মনে রাখতে হবে এই বর্ণমালা আমাদের ভিক্ষা দেওয়া কোনো দান নয়, এটি অর্জিত হয়েছে প্রাণের বিনিময়ে।
রফিক-জব্বারের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। আজকের তরুণদের কলমে, মেধা ও শ্রমের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে হবে।
ডিজিটাল যুগে আমরা যখন বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি ভাষার চর্চা করি, তখন শহীদদের আত্মা হয়তো গুমরে কাঁদে। ভাষাকে শুদ্ধভাবে বলা ও লেখা হলো শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান।
প্রতিটি ছাত্রকে হতে হবে বায়ান্নর সেই দামাল ছেলেদের উত্তরসূরি। দেশপ্রেমের যে আগুন তারা জ্বেলেছিলেন, তা যেন কোনোদিন নিভে না যায়।
বায়ান্নর সেই ভাষা আন্দোলনই ছিল আমাদের স্বাধীনতার সূতিকাগার। ভাষা থেকেই শুরু হয়েছিল স্বাধিকার আন্দোলন, যা ১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন মানচিত্র এবং লাল-সবুজের পতাকার জন্ম দেয়। সালাম-বরকতের রক্তই মূলত আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে দালালি প্রত্যাখ্যান করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
আজকের ২১শে ফেব্রুয়ারি কেবল ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর দিন নয়; এটি নিজেকে প্রশ্ন করার দিন—আমরা কি সেই চেতনার যোগ্য হতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের মায়ের ভাষাকে সঠিক মর্যাদা দিতে পারছি?
হে বাংলার দামাল ছেলেরা, মনে রেখো—আমাদের মানচিত্রের প্রতিটি ইঞ্চিতে লেগে আছে সেই অমর শহীদদের রক্ত। শফিউরের আর্তনাদ, রফিকের সাহস আর বরকতের ত্যাগ আমাদের জাতীয় জীবনের চিরস্থায়ী সম্পদ। এই রক্তের দাগ মুছে ফেলার সাধ্য কোনো অপশক্তির নেই। যারা ভাষাকে ভালোবাসতে জানে না, তারা দেশকে ভালোবাসতে জানে না।
১৯৫২ সালের সেই ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাত দশক আগের কথা হলেও, এর আবেদন চিরন্তন। রফিক-জব্বার-সালামরা মরে গিয়েও অমর হয়ে আছেন আমাদের বর্ণমালায়, আমাদের প্রতিটি উচ্চারণে। তরুণ প্রজন্মের কাঁধে আজ সেই দায়িত্ব, যেন এই ত্যাগের মহিমা পরবর্তী শতকের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝেও একইভাবে শিহরণ জাগায়।
রক্তের আখরে লেখা এই নাম—বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা। এই ঋণ আমরা কোনোদিন শোধ করতে পারব না, কেবল চেতনায় ধারণ করে এগিয়ে যেতে পারব এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে। শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি, কোনোদিন যাবেও না।
মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন