বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ কাটিয়ে দেশ যখন পুনর্গঠনের পথে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ও তথ্যপ্রবাহের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও মিডিয়া কৌশলবিদ জহির উদ্দিন স্বপন।
গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাষ্ট্রপতি কর্তৃক শপথ গ্রহণের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়’-এর পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। তার সঙ্গে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক প্রচার কৌশলের বিশেষজ্ঞ ইয়াসের খান চৌধুরী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের মতে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম যখন দীর্ঘ সময় ধরে ‘ভয়’ এবং ‘অনিশ্চয়তার’ দোলাচলে ছিল, তখন জহির উদ্দিন স্বপনের মতো একজন পরিপক্ক নেতাকে এই দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া বর্তমান সরকারের এক দূরদর্শী ‘মাস্টারস্ট্রোক’।
শপথ ও প্রত্যাশার মেলবন্ধন
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে শপথ নেওয়ার পর থেকেই জহির উদ্দিন স্বপনকে ঘিরে নতুন আশার আলো দেখছে সংবাদকর্মীরা। তার দীর্ঘ সংসদীয় ক্যারিয়ার এবং বিএনপির ‘মিডিয়া সেল’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার সাফল্যই তাকে এই পদের জন্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি ঘোষণা করেছেন, "সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করাই হবে আমাদের প্রধান অঙ্গীকার।"
সংসদীয় অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক ভিত্তি
জহির উদ্দিন স্বপন কেবল একজন নীতি-নির্ধারক নন, তিনি মাঠ পর্যায় থেকে উঠে আসা একজন জননেতা। তার রাজনৈতিক জীবনের গতিপথ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
আশির দশকে বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে পদচারণা শুরু করা স্বপন বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময় থেকেই তার সাংগঠনিক ও বাগ্মীতার গুণাবলী প্রস্ফুটিত হয়।
জহির উদ্দিন স্বপন ১৯৯৬ (ষষ্ঠ সংসদ) এবং ২০০১ (অষ্টম সংসদ) সালে বরিশাল-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিনি ১,০০,৫৫২ ভোট পেয়ে পুনরায় তার আসনটি উদ্ধার করেন।
বিএনপির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তিনি দলের জন্য আধুনিক এবং ‘ডিজিটাল কমিউনিকেশন’ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করেছেন। 'বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন' (বিএনআরসি)-এর পরিচালক হিসেবে তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান এখন মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বড় পাথেয় হবে।
প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী: আধুনিকতার সংযোজন
জহির উদ্দিন স্বপনের অভিজ্ঞতার পাশে তারুণ্যের শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছেন প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। ময়মনসিংহ-৯ আসন থেকে নির্বাচিত এই নবীন নেতা রাজনীতিতে একবিংশ শতাব্দীর ‘তথ্য যুদ্ধ’ এবং ‘ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং’-এর কারিগর হিসেবে পরিচিত। তাদের এই যুগলবন্দী বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম যেমন— বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার এবং পিআইবি-কে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জহির উদ্দিন স্বপনের সামনে আগামীর পাঁচ চ্যালেঞ্জ
সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনের প্রথম সপ্তাহেই মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন তার অগ্রাধিকার তালিকা স্পষ্ট করেছেন। তার সামনে যে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে, তার একটি রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো-
ভয়মুক্ত সাংবাদিকতা: বিগত দেড় দশকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর যে অদৃশ্য কাঁচি চলেছিল, তা অপসারণ করে সাংবাদিকদের জন্য একটি নিরাপদ ও স্বাধীন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
স্মার্ট তথ্যায়ন ও গুজব প্রতিরোধ: তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গুজব (Disinformation) এবং অপপ্রচার রোধে একটি শক্তিশালী ‘ফ্যাক্ট-চেক’ ব্যবস্থা চালু করা।
রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের পুনর্গঠন: বিটিভি এবং বেতারকে একপেশে প্রচারণার গণ্ডি থেকে বের করে এনে গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে গড়ে তোলা।
তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন: সরকারি তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে জনগণের তথ্যের অধিকার (RTI) নিশ্চিত করা।
স্মার্ট কার্ড ও জনকল্যাণ: সম্প্রতি তিনি ‘স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ‘ফার্মার কার্ড’-এর মতো যুগান্তকারী ডিজিটাল উদ্যোগ ঘোষণা করেছেন, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সাহায্য করবে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক সংযোগ
জহির উদ্দিন স্বপনের কর্মপরিধি কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দুবার বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা 'পার্লামেন্টারিয়ানস ফর গ্লোবাল অ্যাকশন' (PGA)-এর এশিয়া অঞ্চলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে তার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এটি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
চ্যালেঞ্জিং উত্তরণ ও বরিশালবাসীর গর্ব
বরিশালের গৌরনদী-আগৈলঝাড়ার মাটি ও মানুষের নেতা জহির উদ্দিন স্বপন এখন জাতীয় পর্যায়ে তথ্যের অতন্দ্র প্রহরী। তার অভিজ্ঞতার ঝুলি এবং মেধার প্রয়োগের মাধ্যমে তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধিদপ্তরের কর্মচারীদের মধ্যে এক নতুন কর্মচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ শ্রম এবং সততার মধ্য দিয়ে এই মন্ত্রণালয়কে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই এখন তার মূল লক্ষ্য।
নতুন সূর্যোদয়ের এই ক্ষণে, দেশবাসী তাকিয়ে আছে জহির উদ্দিন স্বপনের সুচিন্তিত পদক্ষেপের দিকে—যেখানে তথ্য হবে অবাধ, সংবাদ হবে নিরপেক্ষ এবং কণ্ঠ হবে স্বাধীন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন