রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘যমুনা’, নতুন ঠিকানায় ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম
রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘যমুনা’, নতুন ঠিকানায় ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চূড়ান্ত হয়েছে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি বাসভবন। রাজধানীর হেয়ার রোডে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘যমুনা’-কেই বেছে নেওয়া হয়েছে সরকারপ্রধানের নতুন আবাসস্থল ও কর্মস্থল হিসেবে। গতকাল বুধবার গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সরকারি আবাসন পরিদপ্তর কেবল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনই নয়, বরং নতুন মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নাম ও পদমর্যাদা অনুযায়ী বরাদ্দকৃত বাসার তালিকাও চূড়ান্ত করেছে।

বিগত দেড় দশকের শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ‘গণভবন’ বর্তমানে গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকায়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর শীর্ষ এই পরিবর্তনটি ঐতিহাসিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

হেয়ার রোডের সোয়া তিন একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা এখন প্রধানমন্ত্রীর নতুন ঠিকানা। বর্তমানে এখানে সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অবস্থান করছেন। সরকারি আবাসন পরিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল ২৭ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ইউনূস যমুনা ছেড়ে দেবেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী যমুনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং একটি আধুনিক আবাসন সুবিধা গড়ে তুলতে দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নিরাপত্তা ও সচিবালয়ে যাতায়াতের সহজলভ্যতার কথা বিবেচনা করে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা বা শেরেবাংলা নগরের পরিবর্তে যমুনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে গুলশানে তাঁর নিজস্ব বাসভবনে অবস্থান করছেন। তবে আসন্ন ঈদুল ফিতরের কুশল বিনিময় এবং পবিত্র রমজানের ইফতার অনুষ্ঠানগুলো তিনি যমুনার সবুজ চত্বরে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাই ঈদের আগেই যমুনার প্রধান সংস্কারকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে গণপূর্ত বিভাগ।

ঢাকার হেয়ার রোড, মিন্টো রোড এবং বেইলি রোড—যা দীর্ঘকাল ধরে ‘মন্ত্রিপাড়া’ হিসেবে পরিচিত, সেখানে আবারও ফিরেছে ব্যস্ততা। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা একে একে বাংলোবাড়িগুলো ছেড়ে দিচ্ছেন। সরকারি আবাসন পরিদপ্তর গতকাল মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য ৩৬টি বাংলোবাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দের তালিকা চূড়ান্ত করেছে।

কেবল হেয়ার রোড বা মিন্টো রোড নয়, বেইলি রোড এবং ধানমন্ডিতেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

মিন্টো রোডে থাকছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। মিন্টো রোডে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, মিন্টো রোডে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং মিন্টো রোডে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদকে বাসা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে ধানমন্ডিতে এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে গুলশানে সরকারি বাসা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহকে ২ হেয়ার রোডের বাংলোবাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগে থেকেই মিন্টো রোডের ৩৩ নম্বর বাংলোবাড়িতে অবস্থান করছেন (পূর্ববর্তী জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে)। বর্তমান মন্ত্রিসভায় তাঁর অন্তর্ভুক্তি ও টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে পদের ধারাবাহিকতায় তিনি একই বাড়িতে অবস্থান করবেন।

নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে হেয়ার রোডে অবস্থিত বিলাসবহুল মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট। এখানে তিনটি দশতলা ভবনের ৩০টি ফ্ল্যাট প্রতিমন্ত্রীদের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতিটি ফ্ল্যাট প্রায় নয় হাজার বর্গফুট আয়তনের, যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংস্কারকাজ শেষে ঈদুল ফিতরের পর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাসাগুলোতে উঠতে পারবেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গণভবনে যে ভাঙচুর ও লুটপাট চলেছিল, তাতে ভবনটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর জন্য নতুন বাসভবন খুঁজে বের করা ছিল গত কয়েক মাসের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যমুনার পাশাপাশি ২৪ ও ২৫ নম্বর বাংলোবাড়ি দুটিও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ ও অন্যান্য) ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রশাসনিক বিন্যাসের এই পরিবর্তন কেবল বাসস্থানের বদল নয়, বরং এটি বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। যমুনা এখন থেকে কেবল একটি অতিথি ভবন নয়, বরং দেশের ভাগ্য নির্ধারণী সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে। নির্বাচিত সরকার এবং তাদের মন্ত্রিসভার এই নতুন আবাসন ব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক কাজকে আরও গতিশীল করবে এবং মন্ত্রিপাড়ার দীর্ঘ দিনের শূন্যতা কাটিয়ে জনবান্ধব এক পরিবেশ তৈরি করবে বলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

এএন