জ্বালানি সংকট নেই, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কিনবেন না’ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম
জ্বালানি সংকট নেই, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কিনবেন না’ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী

শুক্রবার ছুটির দিনে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলো সাধারণত কিছুটা শান্ত থাকে, কিন্তু আজ চিত্রটা ছিল একদম উল্টো। সকাল থেকেই শহরের বড় বড় ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা গেছে।

বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িচালকদের মধ্যে ফুল ট্যাংক করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা দেখা যায়। সাধারণ মানুষের মনে একটাই ভয়, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কি আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে না কি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

ভোক্তাদের এই অস্থিরতা যে কেবল চোখের দেখা নয়, তা প্রমাণ করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির সরবরাহ চিত্র। পরিসংখ্যান বলছে, গত সোমবার থেকে পরবর্তী চার দিনে সারা দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ৯৮ হাজার টন। অথচ গত বছরের ঠিক একই সময়ে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৫ হাজার টন। অর্থাৎ চাহিদার গ্রাফ প্রায় দ্বিগুণ উঁচুতে উঠেছে। একইভাবে পেট্রোল এবং অকটেনের চাহিদাও গত বছরের তুলনায় ৪৪ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিপিসি জানায়, এই অতিরিক্ত চাহিদা স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য নয়, বরং মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘরে বা গাড়িতে তেল মজুত করে রাখছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং গুজব ঠেকাতে আজ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তাঁরা সরাসরি পাম্পে গিয়ে তেল নিতে আসা মানুষ এবং পাম্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

পরিদর্শন শেষে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর আমরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও দেশে সরবরাহ চেইন অটুট রাখতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আপনারা আতঙ্কিত হবেন না, পাম্পে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করবেন না।

অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ভোক্তাদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তেলের কোনো হাহাকার নেই। কিন্তু সবাই যদি হঠাৎ করে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে রাখতে শুরু করেন, তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়। দয়া করে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই নিন। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের উর্ধ্বগতি নিয়ে সরকার কি ভাবছে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী একটি ইতিবাচক কিন্তু সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

তিনি জানান, সরকার সব সময় চেষ্টা করে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি না পড়ে। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, আমাদের প্রথম লক্ষ্য হলো দেশে তেলের দাম না বাড়ানো। আমরা ভর্তুকি বা বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে পরিস্থিতি যদি হাতের বাইরে চলে যায়, কেবল তখনই জনগণের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।

মাঠ পর্যায়ের চিত্রে রাজধানীর মগবাজার ও তেজগাঁও এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোর কর্মকর্তারা জানান, গত দুদিন ধরে তাঁদের দম ফেলার সময় নেই। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিক সময়ে একজন গ্রাহক হয়তো ৫ থেকে ১০ লিটার তেল নিতেন, এখন সবাই এসেই বলছেন ট্যাংক ফুল করে দিতে। এতে করে পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়ছে এবং দীর্ঘ সারির কারণে যানজটেরও সৃষ্টি হচ্ছে। তবে তাঁরা এও নিশ্চিত করেছেন যে কোম্পানি থেকে তেলের সরবরাহ এখনো নিয়মিত রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০২৬ সালের এই সংকটে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার গুজব মানুষের মধ্যে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশ সরকারের হাতে কয়েক সপ্তাহের পর্যাপ্ত মজুত সবসময়ই থাকে, তাই এক সপ্তাহের মধ্যেই তেল ফুরিয়ে যাওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই।

আজকের এই পরিদর্শন এবং মন্ত্রীদের সরাসরি উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এক অনিশ্চিত বাস্তবতা হলেও, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আগাম সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। পাম্পে দীর্ঘ সারি কমিয়ে আনতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সাধারণ মানুষের সচেতনতা এবং গুজবে কান না দেওয়ার মানসিকতা।

জেএইচআর