দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট নেই। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের বর্তমান মজুত সন্তোষজনক এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। একটি অসাধু চক্রের অবৈধ মজুত করার প্রবণতা এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন আতঙ্কের কারণে বাজারে কিছুটা অস্থিরতা দেখা দিলেও সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। গত এক মাসে দেশজুড়ে বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ জ্বালানি উদ্ধার করা হয়েছে এবং আমদানির নতুন চালান দেশে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান বিভাগের যুগ্মসচিব ও মুখপাত্র মুনির হোসেন চৌধুরী।
জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, দেশের বাজারে এই মুহূর্তে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের যে পরিমাণ মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী বেশ কিছুদিন স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব। মুখপাত্র স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমানে দেশে দৈনিক ১,২০০ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ১,৪০০ মেট্রিক টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো এই চাহিদা অনুযায়ী
মুনির হোসেন চৌধুরী জানান, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য অপরিশোধিত তেল নিয়ে নতুন জাহাজ বঙ্গোপসাগরে ভিড়ছে। এই নতুন চালান খালাস শুরু হলে জ্বালানি মজুত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। ফলে আসন্ন দিনগুলোতে সরবরাহে ঘাটতি হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক কারণ নেই।
বাজারে তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কেন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে জ্বালানি বিভাগ দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে।
১. প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত ক্রয়: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গুজবের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষ মনে করছে যে সামনে তেলের দাম বাড়তে পারে বা সংকট দেখা দিতে পারে। এই অমূলক ভয় থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করে ঘরে রাখার চেষ্টা করছেন অনেকে। একে ‘প্যানিক বায়িং’ বলা হয়, যা বাজারে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করছে।
২. অবৈধ মজুত প্রবণতা: কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট বেশি লাভের আশায় বাজার থেকে তেল সরিয়ে ফেলছে। তারা জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুখপাত্র জানান, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশব্যাপী ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এই এক মাসের অভিযানে প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার অবৈধভাবে মজুত করা জ্বালানি তেল উদ্ধার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালত।
বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে এই তদারকি আরও জোরদার করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ হুশিয়ারি দিয়েছে যে, লাইসেন্স ছাড়া বা নির্ধারিত সীমার বাইরে কেউ তেল মজুত করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে দেশে সেচ মৌসুম চলছে। বোরো চাষসহ অন্যান্য কৃষিকাজের জন্য ডিজেল অপরিহার্য। এই অতিগুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষকরা যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য সরকার বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করছে।
সারাদেশের জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে তারা নিজ নিজ জেলায় কৃষকদের ডিজেল প্রাপ্তি নিশ্চিত করেন। সেচ পাম্পগুলোর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। কৃষি উৎপাদন যেন জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে তদারকি বাড়াতে বলা হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নতুন জাহাজ আসার ফলে শোধনাগারের কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চলবে। সরকার কেবল বর্তমান চাহিদা মেটানো নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। আমদানিকৃত তেলের মান নিয়ন্ত্রণ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রকল্পগুলোর কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে গুজব ছড়ানো রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের শামিল। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে এবং গুজবে কান দিয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদিকে, খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের স্বচ্ছতা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকার আশ্বস্ত করেছে যে, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তারা বদ্ধপরিকর। পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের মাধ্যমে নিয়মিত জ্বালানি আমদানির এলসি (LC) খোলা হচ্ছে এবং সরবরাহের চেইন সচল রাখা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের এই ব্রিফিংয়ের পর এটা পরিষ্কার যে, দেশে জ্বালানির কোনো প্রকৃত সংকট নেই। যা আছে তা হলো অব্যবস্থাপনা এবং মানুষের ভয়। সরকারের কঠোর নজরদারি এবং নতুন তেলের জাহাজ আগমনের খবরে খুব দ্রুতই বাজারের এই অস্থিরতা কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত থাকলে এবং কৃষকদের জ্বালানি নিশ্চিত করা গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন