বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে বৈদেশিক বাণিজ্যচুক্তির বেড়াজালে জ্বালানি নিরাপত্তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর শঙ্কা।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্যচুক্তি দেশের জ্বালানি খাতের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ তথা সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করছে।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির আয়োজনে ‘বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার বক্তব্যে নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতির বৈপরীত্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা দিয়েছিল তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশভিত্তিক বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে, তার বাস্তবতা ভিন্ন। এই চুক্তির ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা কার কাছ থেকে তেল বা জ্বালানি কিনব, তার জন্যও এখন অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ থাকা উচিত, সেখানে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কেন সাধারণ মানুষের জ্বালানি প্রাপ্যতাকে অনিশ্চিত করবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের বর্তমান দশা নিয়ে তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে দেশের অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে, বিভিন্ন খাতের সংস্কারের জন্য সুনির্দিষ্ট পুস্তক তৈরি হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের সংস্কার প্রস্তাবগুলো কি এখন তবে মিউজিয়ামে (জাদুঘরে) রাখার সময় হয়েছে? কেন এই প্রস্তাবগুলো অনুশীলনে নেওয়া হচ্ছে না? আইএমএফ কেন কিস্তি ছাড় করছে না, সেই প্রশ্নও আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সংস্কার কমিশন গঠনের অঙ্গীকার থাকলেও দুই মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এখনো তার কোনো হদিস নেই। সরকারের এই ধীরগতিকে তিনি ‘ভালো সংকেত নয়’ বলে অভিহিত করেন।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অর্থনীতির একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, জ্বালানি এবং ব্যাংক খাত হলো অর্থনীতির দুটি ফুসফুস। আর এই পুরো শরীরের হৃদয় হলো ‘সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা (পিএফএম)যার ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব আয়, ব্যয় এবং ঘাটতি অর্থায়নের হিসাব চলে।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছর ধরে জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিমূলক করে রাখা হয়েছে। "আমাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে বিপুল গ্যাস থাকার সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাপেক্সকে বিনিয়োগহীন করে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ বানিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা না পেরেছি বিদেশি বিনিয়োগ আনতে, না করেছি নিজস্ব বিনিয়োগ। উৎপাদনমুখী নীতির পরিবর্তে আমদানি বাণিজ্যনির্ভর জ্বালানি নীতি অনুসরণ করা হয়েছে, যা কেবল একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তৈরি করেছে।
নতুন সরকার ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বা ক্রীড়া কার্ডের মতো জনতুষ্টিমূলক প্রকল্পগুলোর আর্থিক সংগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এত বেশি প্রকল্পের বোঝা বহন করার সক্ষমতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তার মতে, একটি লম্বা লাফ (লং জাম্প) দেওয়ার জন্য অ্যাথলেটকে যেমন কয়েক পা পিছিয়ে আসতে হয়, অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে টেকসই ভবিষ্যতের জন্য সরকারকে এখন কিছুটা সংযত হওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে জ্বালানি খাতের সংকট উত্তরণে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তিনটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করেন।
গরিব মানুষের করের টাকায় যেন বিত্তবানদের ভর্তুকি দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নিজস্ব খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ আবিষ্কারে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার এক বিধ্বস্ত অর্থনীতির উত্তরাধিকার নিয়ে পথ চলা শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এই চাপকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার চূড়ান্ত ফল হিসেবে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
‘আগামী বাজেটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমেই অর্থনৈতিক সুরক্ষা অর্জন করা যাবে’ শীর্ষক এই ছায়া সংসদে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটিকে হারিয়ে বিজয়ী হয় ময়মনসিংহের ‘ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিচারক প্যানেলে ছিলেন অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও বিশেষজ্ঞরা। বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও সনদপত্র তুলে দেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
পরিশেষে, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের এই কড়া সমালোচনা সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। আসন্ন বাজেটে এই জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিফলন না ঘটলে সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন