বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, ঠিক তেমনি ‘অপতথ্য’ বা ‘ভুল তথ্য’ গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর (UNESCO) কারিগরি সহযোগিতা এবং একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
বুধবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনেসকোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এই গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে অপতথ্য রোধ, গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা রক্ষা এবং সাংবাদিকতার গুণগত মানোন্নয়নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ প্রবাহ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দাপটে তথ্যের উৎস এখন বহুমুখী। তবে এই গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে তৈরি করা ডিপফেক নিউজ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘ভুল তথ্য কেবল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষতি করে না, এটি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সংহতিকেও বাধাগ্রস্ত করে। ডিজিটাল যুগে তথ্যের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, ইউনেসকোর দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং কারিগরি দক্ষতা বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর গাইডলাইন বা রোডম্যাপ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। এটি কেবল সরকারি পর্যায় নয়, বরং সাধারণ নাগরিক এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
সাক্ষাৎকালে ইউনেসকোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ বাংলাদেশে সংস্থাটির চলমান বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন। তিনি জানান, ইউনেসকো বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গুজব বা প্রোপাগান্ডা রুখতে ‘ফ্যাক্টচেকিং’ বা তথ্য যাচাইয়ের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে।
সুসান ভাইজ বলেন, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া অপতথ্য রুখে দেওয়া সম্ভব নয়।তিনি আরও জানান যে, ইউনেসকোর উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যৎ সংবাদকর্মীরা যেন সংবাদ প্রকাশের আগেই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করার কৌশলগুলোতে পারদর্শী হতে পারেন।
বৈঠকে মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ইউনেসকোর এই উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ইউনেসকোর যৌথভাবে কাজ করার ব্যাপক ক্ষেত্র রয়েছে। বিশেষ করে:
১. পলিসি বা নীতিমালা প্রণয়ন:ডিজিটাল নিরাপত্তার ভারসাম্য বজায় রেখে তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করা।
২. কারিগরি সহায়তা:গুজব শনাক্ত করার আধুনিক প্রযুক্তি ও টুলস ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি।
৩.তৃণমূল সচেতনতা:প্রান্তিক পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল সাক্ষরতা ছড়িয়ে দেওয়া।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ইউনেসকোর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী যদি আমরা আমাদের গণমাধ্যম নীতিমালা এবং ফ্যাক্টচেকিং ফ্রেমওয়ার্ক সাজাতে পারি, তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং সচিব মাহবুবা ফারজানা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের দায়িত্বশীলতা তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তরুণ সমাজই ইন্টারনেটের প্রধান ব্যবহারকারী, তাই তাদের যদি অপতথ্য চেনার সক্ষমতা তৈরি করা যায়, তবে গুজবের বিস্তার অর্ধেক কমিয়ে আনা সম্ভব।
সচিব মাহবুবা ফারজানা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইউনেসকোর সঙ্গে প্রশাসনিক ও কারিগরি সমন্বয়ের বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অন্যদিকে, সুসান ভাইজ বাংলাদেশ সরকারের এই ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসা করেন এবং অপতথ্য মোকাবিলায় সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেটের প্রসার ঘটলেও তথ্যের সঠিকতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন, অর্থনীতি কিংবা ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে ছড়ানো গুজব অনেক সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
তথ্যমন্ত্রীর এই ‘রোডম্যাপ’ তৈরির প্রস্তাবটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলত তিনটি লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে:
স্বচ্ছতা: সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা যাতে গুজবের অবকাশ না থাকে।
শিক্ষা: পাঠ্যপুস্তক বা বিশেষ কোর্সের মাধ্যমে তথ্যের বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তৈরি করা।
প্রযুক্তি: এআই-ভিত্তিক টুলস ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুয়া সংবাদ শনাক্তকরণ।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ এবং ইউনেসকোর সহযোগিতার আশ্বাস দেশের গণমাধ্যম ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের আহ্বান অনুযায়ী যদি একটি শক্তিশালী রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশ কেবল ডিজিটাল বাংলাদেশ নয়, বরং একটি ‘তথ্য-সুরক্ষিত’ স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
ইউনেসকোর প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যকার এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা শেষে উভয় পক্ষই আগামী দিনগুলোতে নিবিড়ভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তথ্যসূত্র: বাসস
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন