দেশের ঝিমিয়ে পড়া শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় সচলের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দেশের রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করেন এবং সেগুলোকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালু করার জন্য দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে বস্ত্র ও পাট খাতের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুসংহত করতে একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমান বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, দেশের শিল্প খাতের স্থবিরতা কাটানোই ছিল এই সভার প্রধান উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যথাযথ তদারকি ও বিনিয়োগের অভাবে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে আছে, যা অর্থনীতির জন্য এক বড় ক্ষতি। এসব কারখানা চালু হলে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে হাজার হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে।
সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বস্ত্র ও পাট খাতের বন্ধ কলকারখানাগুলোর তালিকা তৈরি এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) বা সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় সেগুলো চালুর উদ্যোগ। পুরনো আমলের যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করে আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা এবং ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। কারখানা চালু করার পাশাপাশি শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে অংশ নেন বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ বিভিন্ন অংশীজন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ‘সোনালী আঁশ ‘খ্যাত পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তুঙ্গে। বাংলাদেশ যদি উন্নত মানের পাটজাত পণ্য উৎপাদন করতে পারে, তবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এটি পোশাক খাতের মতোই বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
এছাড়া, বস্ত্র খাতের আধুনিকায়নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য কেবল কাঁচামাল রপ্তানি করা নয়, বরং ফিনিশড প্রোডাক্ট বা তৈরি পণ্য বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া।বন্ধ থাকা টেক্সটাইল মিলগুলো চালু হলে স্থানীয় বাজারে সুতা ও কাপড়ের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পোশাক শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বৈঠকে বলেন, অতীতের অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে পড়েছিল। বর্তমান সরকার শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। শিল্পায়নের পথে যে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকার চায় দেশের প্রতিটি অঞ্চলে শিল্পের প্রসার ঘটুক, যাতে মানুষ নিজ জেলাতেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়।
বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই টাস্কফোর্স বন্ধ কারখানার আর্থিক ও আইনি জটিলতা নিরসনে কাজ করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সাথে আলোচনা করছি। যারা সত্যিকার অর্থে কারখানা চালাতে আগ্রহী, তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বস্ত্র ও পাট খাতের অবদান অপরিসীম। দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে অবস্থিত জুট মিলগুলো চালু হলে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলে যাবে।
সরকারের এই মহাপরিকল্পনায় রয়েছে:
১. সেবা সহজীকরণ: কলকারখানা স্থাপনের লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রক্রিয়া ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের আওতায় আনা।
২. জ্বালানি নিরাপত্তা: শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৩. রপ্তানি প্রণোদনা: পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বিশেষ ভর্তুকি বা ইনসেন্টিভ প্রদান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই জরুরি বৈঠক প্রমাণ করে যে, সরকার দেশের শিল্প খাতের সংকট নিরসনে কতটা আন্তরিক। বন্ধ কারখানাগুলো সচল করা কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের অঙ্গীকার। যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
বিকেলের দিকে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগামী এক মাসের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। দেশের সাধারণ মানুষ এখন আশা করছে, খুব শীঘ্রই কারখানাগুলোর সাইরেন আবারও বেজে উঠবে এবং শিল্পাঞ্চলগুলো কর্মমুখর হয়ে উঠবে।
এএন
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন