দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। আজ মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নওয়াব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষের রোডম্যাপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক জাতীয় কর্মশালার শুভ উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আয়োজিত এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছান। সকাল ১১টায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করা হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ পর্যায়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন শিক্ষা মন্ত্রী ড. এএনএম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন। বক্তারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এই জাতীয় কর্মশালাটি দেশের শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন সরকারের ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারকবৃন্দ, ইউজিসি সদস্যগণ, দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যবৃন্দ, বিশিষ্ট শিক্ষক এবং গবেষকগণ। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, শিল্প খাতের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীরা এই অধিবেশনে অংশ নেন। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লক্ষ্যেই এই বৈচিত্র্যময় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অধিবেশন শেষে কর্মশালায় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেশনেই উচ্চশিক্ষার আধুনিকায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়। স্নাতকধারীদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের কেবল ডিগ্রি অর্জনের পরিবর্তে নমনীয় দক্ষতা উন্নয়ন এবং চাহিদাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলা।
শিল্প একাডেমি সহযোগিতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সাথে শিল্প খাতের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা, যাতে শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চশিক্ষায় ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিকীকরণ, শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন, গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করে তোলা। সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার সাধন।
ইউজিসি সূত্রে জানানো হয়েছে, এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মূল্যবান মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে একটি কার্যকর নীতি নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হবে। এই রোডম্যাপটিই হবে আগামী দিনে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। সরকারের লক্ষ্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সনদ বিতরণের কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না রেখে সেগুলোকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞান সৃজন ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করা। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখিয়েছেন যা দেশের তরুণ সমাজকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলবে।
জাতীয় এই কর্মশালাটি উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে যে আমলাতান্ত্রিক বা পদ্ধতিগত জটিলতা রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হবে। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই ধরনের উদ্যোগ উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করবে।
এটি কেবল বর্তমান সময়ের চাহিদা মেটাবে না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষে প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণকারীদের সাথে কুশল বিনিময় করেন এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জাতীয় কর্মশালাটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এএন/জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন