দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থানের পর সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাইয়ে তাকে আটক করা হয়েছে এবং দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই গ্রেফতার বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দুর্নীতির অভিযোগ ও দেশত্যাগ
বেনজীর আহমেদ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আইজিপি পদ থেকে অবসরের প্রায় দুই বছর পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসে। একটি জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তিনি দেশ ছেড়ে দুবাইয়ে চলে যান।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালতের নির্দেশে তার মালিকানাধীন সাভানা রিসোর্ট ও ন্যাচারাল পার্কের নিয়ন্ত্রণ নেয় গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন। একই সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের ভিত্তিতে তার বিভিন্ন সম্পত্তি জব্দের নির্দেশও দেয় আদালত।
রেড নোটিশ ও মামলার অগ্রগতি
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে থেকেই বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু করে দুদক। দেশত্যাগের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক এই আইজিপির বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে এবং আরেকটি মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বিচার চলছে। পাশাপাশি পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ আরও পাঁচটি মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে তাকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির আবেদন করা হয়। আদালতের অনুমোদনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন পাঠানো হলে ইন্টারপোল তাকে গ্রেফতার করে।
দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানান, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই থেকে আনুষ্ঠানিক বার্তা পায়। এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে।
তিনি বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮সহ বিভিন্ন ধারা এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার ১৯৭৩-এর ১১ ধারায় মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বর্তমানে এনসিবি ঢাকা রেড নোটিশ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং গ্রেফতারের পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। দুদক প্রয়োজনীয় মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তদন্তসংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর প্রত্যর্পণ আবেদন দ্রুত আবুধাবিতে পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।
আলোচিত ও সমালোচিত কর্মজীবন
পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন কারণে আলোচনায় ছিলেন বেনজীর আহমেদ। র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে তিনি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়ও আসেন।
র্যাবের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠলেও তিনি এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করতেন। ২০১৫ সালে এক বক্তব্যে তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে ‘সস্তা প্রচারণা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এছাড়া ঢাকার বোট ক্লাবের সভাপতি হিসেবে তার নাম সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বাণিজ্যিক ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন নিয়ে জাতীয় সংসদেও প্রশ্ন ওঠে।
এর আগে ডিএমপি কমিশনার থাকাকালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনের সড়ক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা এবং ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ছত্রভঙ্গের ঘটনাও তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে পরিচিত এই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার গ্রেফতার এবং দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া এখন জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি
এম জি
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন