হারানো অতীত প্রতিশোধের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশ গঠনে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা কামনা করেন সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা স্মরণ করে বলেন, কারাবাসের সময় যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তাঁর পিঠের হাড় এখনও বাঁকা হয়ে আছে এবং তিনি প্রায়ই ব্যথা অনুভব করেন। তবে প্রতিশোধ নিলে এই ক্ষতি পূরণ হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার সাথে যা হয়েছে, এখন প্রতিশোধ নিলে সেটা ফেরত পাব না। তাই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আমরা দেশের জন্য কী করতে পারি সেই চেষ্টা করতে পারি।” প্রতিহিংসা পরিহার করার এই বার্তাটি দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও তিনি সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানান।
১৬ জুন বাংলাদেশের সংবাদপত্রের কালো দিবস। দিনটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের এই দিনে মাত্র চারটি পত্রিকা রেখে বাকিগুলোর প্রকাশনা বাতিল করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল কায়েম করা হয়। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনেন। বর্তমান সরকারও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সরকার একা সব করতে পারবে না। ভালো কাজের পথ দেখাতে এবং ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতে সংবাদমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
যুবসমাজের বর্তমান পরিস্থিতি ও মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তরুণদের বিপুল শক্তিকে ইতিবাচক খাতে কাজে লাগাতে তিনি খেলাধুলা, সংস্কৃতি চর্চা এবং বিজ্ঞান মেলার ওপর জোর দেন। দেশজুড়ে খেলার মাঠের সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছে। সম্প্রতি একটি শিক্ষা বিভাগীয় আয়োজনে দলমত নির্বিশেষে প্রায় ২২ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিলেও তা সংবাদমাধ্যমে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, জীবন্ত মানুষকে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করার মতো ঘটনা অস্বাভাবিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এটি রোধ করতে স্কুল পর্যায় থেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি, অথচ সম্পদ ও সক্ষমতার ব্যাপক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাজের চাপের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে তিনি তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “অফিসে কখন ঢুকছি আর কখন সন্ধ্যা হচ্ছে, তা বোঝার উপায় থাকে না। কাজের পরিধি অনুযায়ী দিনটা ২৪ ঘণ্টার বদলে ৪৮ ঘণ্টা হলে দেশের জন্য হয়তো আরও ভালোভাবে কাজ করা যেত।”
মতবিনিময় সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে দুপুরের খাবারে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন ও শাহাদাত হোসেন স্বাধীনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন