ভাতের থালা থেকে শুরু করে সকালের নাস্তার ফলের ঝুড়ি, প্রতিদিনের অতি পরিচিত খাদ্যতালিকাই এখন যেন একেকটি অদৃশ্য বিষের দোকান। চাল ধবধবে সাদা ও উজ্জ্বল করতে বিষাক্ত ইউরিয়া ও হাইড্রোস, কাঁচা শাকসবজি সতেজ ও আকর্ষণীয় রাখতে নিষিদ্ধ কীটনাশকের অতিব্যবহার, আর ফল দ্রুত পাকাতে বা সংরক্ষণে কার্বাইড, ইথোফেন ও ফরমালিনের অবাধ মিশ্রণ জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিয়েছে এক ভয়াবহ মহামারীর মুখে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, বরং একটি নীরব গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে ক্যানসার, কিডনি অকেজো হওয়া এবং লিভার সিরোসিসের মতো প্রাণঘাতী রোগ ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে। এই ভয়াবহ চোরাবালি থেকে বাঁচতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও রান্নাঘরের প্রতিরোধ জরুরি, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রকে তার সম্পূর্ণ শক্তি নিয়ে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে এক আপসহীন যুদ্ধে নামতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজার থেকে আমরা যা-ই কিনি না কেন, তার সিংহভাগই কোনো না কোনোভাবে রাসায়নিক দ্বারা দূষিত। মোটা চালকে মেশিনে ছেঁটে মিনিকেট বা নাজিরশাইল নাম দিয়ে চকচকে করার প্রক্রিয়ায় চালের ভেতরের পুষ্টিগুণ তো নষ্ট করাই হচ্ছে, পাশাপাশি যুক্ত করা হচ্ছে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক। ডাল ও মসলার রঙ আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হচ্ছে টেক্সটাইল গ্রেডের বিষাক্ত রঙ, যা সরাসরি লিভার ও কিডনি ধ্বংসের জন্য দায়ী।
শীত বা গ্রীষ্ম, যেকোনো মৌসুমের সবজি ক্ষেত থেকে তোলার আগের দিন পর্যন্ত অতিমাত্রায় কীটনাশক ছিটানো হচ্ছে, যার অবশিষ্টাংশ রান্নার পরও খাদ্যে থেকে যায়। অন্যদিকে, আম, কলা, পেঁপে বা আনারসের মতো মৌসুমী ফলগুলো বাজারে আসার আগেই কৃত্রিম হরমোন ও কেমিক্যালের মাধ্যমে পাকানো হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বাজারের পুরো সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলকে এক রাতে রাতারাতি বিষমুক্ত করা সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা এবং কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এই বিষের তীব্রতা ও ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। পুষ্টিবিদদের মতে, গৃহস্থালি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রতিটি পরিবারকে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিতে পারে।
যেমন, লবণ ও ভিনেগার পানির জাদুকরী কার্যকারিতার কথা বলা যায়। বাজার থেকে আনা সবজি, ফলমূল বা শাক সরাসরি ফ্রিজে বা রান্নায় নেওয়া বড় ধরনের ভুল। এগুলো ব্যবহারের আগে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্বাভাবিক পানিতে সামান্য খাবার লবণ অথবা ২ চামচ ভিনেগার মিশিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হবে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে উপরিভাগের ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত দূর করা সম্ভব। ভিজিয়ে রাখার পর পুনরায় পরিষ্কার প্রবাহিত পানিতে তা ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো খোসা বর্জনের কঠোর অভ্যাস করা। আপেল, নাশপাতি, শসা, গাজর কিংবা বেগুনের মতো যেসব ফল ও সবজি খোসাসহ খাওয়ার প্রাচীন অভ্যাস রয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পরিহার করাই শ্রেয়। কারণ, বেশিরভাগ কীটনাশক ও মোমের প্রলেপ বা ওয়াক্স কোটিং ফলের খোসাতেই জমে থাকে। তাই এগুলো ব্যবহারের আগে অবশ্যই খোসা পুরু করে ছাড়িয়ে নিতে হবে।
এর পাশাপাশি অসময়ের ফল ও কৃত্রিম চাকচিক্য বর্জন করা প্রয়োজন। বাজারে অসময়ে বা মৌসুমের আগে যেসব ফল ও সবজি পাওয়া যায়, সেগুলো শতভাগ কৃত্রিম উপায়ে পাকানো কিংবা কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারে কেমিক্যাল দিয়ে টিকিয়ে রাখা। তাই সবসময় স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য এবং একদম মৌসুমভিত্তিক দেশী খাদ্য বেছে নেওয়া উচিত।
ভোক্তাদের ভুল আকর্ষণ ও চোখের মোহ ত্যাগ করাও জরুরি। ক্রেতাদের একটি বড় রোগ হলো তারা চকচকে জিনিস খোঁজেন। অতিরিক্ত ধবধবে সাদা চাল, অস্বাভাবিক দাগহীন ও উজ্জ্বল রঙের ফল, কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বড় সাইজের সবজি কেনা থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ কখনো নিখুঁত বা অতিরিক্ত উজ্জ্বল হয় না। যা যত বেশি উজ্জ্বল, তার পেছনে কেমিক্যালের কারসাজি থাকার সম্ভাবনা তত বেশি।
একই সাথে পারিবারিক কৃষি ও ছাদ বাগান করা যেতে পারে। নগর জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও বিষমুক্ত খাদ্যের স্বাদ পেতে নিজের বারান্দা, ছাদ কিংবা বাড়ির ছোট আঙিনাকে কাজে লাগানো দরকার। অন্তত দৈনন্দিন চাহিদার কিছু অংশ যেমন, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, লেবু বা পুদিনাপাতা সম্পূর্ণ জৈব উপায়ে নিজেরা চাষ করার অভ্যাস গড়ে তুললে বাজারনির্ভরতা ও বিষের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকদের ব্যক্তিগত সচেতনতা কেবল একটি সাময়িক ঢাল হতে পারে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চাবিকাঠি সরকারের হাতে। যতক্ষণ না রাষ্ট্র ভেজালকারী ও বিষ প্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে চাবুক ধরবে, ততক্ষণ এই নীরব মহামারী থামানো যাবে না। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের কঠোর ও আপসহীন বাস্তবায়নে সরকারকে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাতে হবে।
প্রথমত, ডিজিটাল টেস্টিং ল্যাব ও স্পট চেকিং বা পরীক্ষাগার ও তাৎক্ষণিক পরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দেশের প্রতিটি বড় কাঁচাবাজার, আড়ত ও জেলা পর্যায়ে আধুনিক ও ডিজিটাল ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরি বা খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ ক্রেতা বা ভোক্তাদের মনে কোনো খাদ্য নিয়ে সামান্যতম সন্দেহ হলেই যেন তারা নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে তাৎক্ষণিকভাবে সেই খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করতে পারেন, সেই আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ল্যাবের ফল জালিয়াতি প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের নিয়মিত ও আকস্মিক হানা প্রয়োজন। ঢাকা শহরের কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী বা বাদামতলীর মতো বড় আড়তগুলো থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাইকারি বাজারগুলোতে নিয়মিত বিরতিতে আকস্মিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে। উৎসব, পার্বণ বা বিশেষ কোনো দিবস ছাড়াও সারা বছর এই তদারকি সচল রাখতে হবে। অপরাধীদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক তদবিরের সুযোগ না দিয়ে স্পটেই লাখ লাখ টাকা জরিমানা ও দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড কার্যকর করতে হবে।
তৃতীয়ত, লাইসেন্স বা বাণিজ্যিক অনুমতিপত্র স্থায়ী বাতিল ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব রাইস মিল বা চালের কলে ক্ষতিকর ইউরিয়া বা ক্যাডমিয়াম মেশাচ্ছে, কিংবা যেসব মসলা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডাল ও হলুদে কাপড়ের রঙ ও ইটের গুঁড়ো ব্যবহার করছে, তাদের ব্যবসায়িক লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে। কেবল জরিমানা নয়, তাদের কারখানা চিরতরে সিলগালা করে মালিক ও ব্যবস্থাপকদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলা দায়ের করতে হবে, যাতে তা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
চতুর্থত, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ট্র্যাকিং বা সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত খাদ্যের পুরো যাতায়াত ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও ট্র্যাকিং বা নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে। খাদ্যটি ঠিক কার খামারে উৎপাদিত হলো, কোন পাইকারের হাত ঘুরে আড়তে এলো এবং কার মাধ্যমে খুচরা বাজারে পৌঁছালো, তার একটি ডিজিটাল রেকর্ড বা বারকোড সিস্টেম চালু করা সম্ভব। এর ফলে ঠিক কোন মধ্যস্বত্বভোগী বা কোন পয়েন্টে বিষ মেশানো হচ্ছে, তা সহজেই শনাক্ত করা যাবে এবং অপরাধীকে গোড়া থেকে ধরা সম্ভব হবে।
পঞ্চমত, মাঠপর্যায়ে কৃষি নজরদারি ও জৈব বালাইনাশক প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। ভেজাল প্রতিরোধের মূল কাজটা শুরু হওয়া উচিত উৎপাদন পর্যায় থেকে। কৃষকদের অতিমাত্রায় ও ক্ষতিকর रासायनिक বা রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশক এবং সেক্স ফেরোমন ট্র্যাপ বা এক ধরণের পোকা ধরার ফাঁদের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারে সরকারিভাবে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে উপকরণ সরবরাহ করতে হবে। field বা মাঠপর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের তদারকি ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে, যাতে কৃষকরা ফসল কাটার ঠিক কতদিন আগে কীটনাশক দেওয়া বন্ধ করবেন, সেই বিষয়ে সঠিক নির্দেশনা পান এবং তা মেনে চলেন।
খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোনো একটি নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থার একক কাজ নয়। এর জন্য বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সুসমন্বিত জাতীয় টাস্কফোর্স বা বিশেষ বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। একই সাথে, স্কুল ও কলেজের পাঠ্যপুস্তকে নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব এবং ভেজাল খাদ্যের কুফল সম্পর্কে অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শৈশব থেকেই নাগরিকরা সচেতন হয়ে ওঠে। দেশের গণমাধ্যমগুলোকে নিয়মিতভাবে ভেজালবিরোধী তথ্যচিত্র ও প্রতিবেদন প্রচারের মাধ্যমে জনসচেতনতা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল মানুষের পেট ভরানোর কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার এবং সুস্থ থাকার মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। প্লেটভর্তি এই অদৃশ্য বিষের আগ্রাসন যদি আমরা এখনই রুখতে না পারি, তবে দেশের পুরো স্বাস্থ্য খাত ভেঙে পড়বে এবং একটি পঙ্গু ও অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি হবে।
এই জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একদিকে যেমন প্রতিটি পরিবারকে সচেতনতার প্রাচীর তুলতে হবে, ঠিক তেমনি ভেজালকারী ও মুনাফালোভী সিন্ডিকেট বা চক্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি নিয়ে চূড়ান্ত অ্যাকশনে বা অভিযানে যেতে হবে। তবেই রক্ষা পাবে আগামী প্রজন্ম এবং নিশ্চিত হবে একটি সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত বাংলাদেশ।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন