বাংলাদেশ ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও গতিশীল করার লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সোমবার সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে বাংলাদেশ সচিবালয়ের ক্যাবিনেট ডিভিশনে (মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ) প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও বন্ধুভাবাপন্ন পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স এবং প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদের একটি বিশেষ চিঠি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া। চিঠিতে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি সৌদি আরবের অকুণ্ঠ সমর্থন, শুভেচ্ছা এবং দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বার্তা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি খাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের উপ-রাষ্ট্রদূত ইব্রাহিম আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদের এই ব্যক্তিগত বার্তা বর্তমান সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সৌদি-বাংলা সম্পর্কের গভীরতার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। চিঠি হস্তান্তরের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌদি ক্রাউন প্রিন্স এবং মহামান্য বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরব কেবল বাংলাদেশের একটি বড় উন্নয়ন সহযোগীই নয়, বরং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক বন্ধনে আবদ্ধ এক পরম মিত্র। বাংলাদেশের প্রতিটি সংকটে এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সৌদি আরব সবসময় পাশে থেকেছে। ক্রাউন প্রিন্সের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ বার্তা আগামী দিনগুলোতে আমাদের দুই দেশের অংশীদারিত্বকে আরও বহুমুখী ও শক্তিশালী করতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক স্তম্ভ—জনশক্তি খাত। সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌদি সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশি প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনীতিতেই ভূমিকা রাখছেন।
প্রধানমন্ত্রী সৌদি রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন, যাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয় এবং বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি (IT), প্রকৌশল, চিকিৎসাসেবা এবং পর্যটন খাতের মতো দক্ষ ও পেশাদার জনশক্তি (Skilled Labor) রপ্তানির সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হয়।
জবাবে সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের সততা ও কর্মনিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আশ্বাস দেন যে, সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ (Vision 2030) বাস্তবায়নে বাংলাদেশি দক্ষ জনশক্তির অংশগ্রহণ বাড়াতে তাদের সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে। একই সাথে তিনি সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়ে সৌদি সরকারের সর্বোচ্চ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত কৌশলগত আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সৌদি আরবের সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (Special Economic Zones) বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewables), পেট্রোকেমিক্যাল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সৌদি আরবের বড় বিনিয়োগের বিশাল সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির আলোচনার সূত্র ধরে জানান, বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শতভাগ নিরাপত্তা এবং আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ নিশ্চিত করছে।
সৌদি রাষ্ট্রদূত এই প্রস্তাবগুলোকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে অত্যন্ত আগ্রহী। বিশেষ করে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) ও তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের বিষয়ে রিয়াদ ইতিবাচক মূল্যায়ন করছে।
দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের পাশাপাশি বৈঠকে ওআইসি (OIC) এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা ও একাত্মতা নিয়ে আলোচনা হয়। মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় সৌদি আরবের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা প্রদান এবং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফর।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন বলেন, আজ সকালের এই বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ। সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের চিঠি হস্তান্তর এবং এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনা প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সুসংহত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের আমলে সৌদি আরবের মতো একটি প্রভাবশালী ও শীর্ষ মুসলিম দেশের সাথে এই ধরনের নিবিড় যোগাযোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে (Economic Diplomacy) অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই বৈঠক একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন