অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঙ্গভবন ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জুলাই ২৩, ২০২৬, ১১:১৮ এএম
অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বঙ্গভবন ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করতে পারেন- এমন আলোচনা আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হয়েছে। এরই মধ্যে বঙ্গভবনের অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিগগিরই সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন বলে বঙ্গভবন-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। একই সূত্রের দাবি, দায়িত্ব ছাড়ার পর রাষ্ট্রপতি কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে পারেন। পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য বিদেশ সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয় আল–জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে তিনি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন। এরপর বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। যদিও সরকার, বিএনপি কিংবা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় প্রায়ই নিজের শারীরিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে বলতেন, ‘শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, যেকোনো সময় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারি।’ সূত্রগুলোর দাবি, পদত্যাগ করলে তিনি চিকিৎসা ও বিশ্রামকে অগ্রাধিকার দিতে চান।

স্বাস্থ্যগত কারণে চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সফরে তার সঙ্গে পরিবারের সদস্য, চিকিৎসক, স্টাফ নার্স এবং বঙ্গভবনের কর্মকর্তারাও ছিলেন। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরে তার হৃদযন্ত্রে কার্ডিয়াক বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই অস্ত্রোপচারের ফলোআপ পরীক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান।

গত ১২ মে কেমব্রিজের রয়াল প্যাপওয়ার্থ হাসপাতালে তার এনজিওগ্রাম করা হয়। পরীক্ষায় হৃদযন্ত্রের একটি ধমনিতে গুরুতর ব্লক ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে এনজিওপ্লাস্টি করে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। এরপর কয়েকদিন চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থেকে নয় দিন পর দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার সময় বঙ্গভবনের প্রেস বিভাগ রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানিয়েছিল, তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক।

চিকিৎসাধীন অবস্থাতেও রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিতে ডিজিটাল অনুমোদন দেন তিনি। একই সময়ে সুদানের প্রধানমন্ত্রী কামিল ইদ্রিসের সঙ্গে তার একটি অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎও অনুষ্ঠিত হয়। দেশে ফিরে তিনি ১৫ জুলাই ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে বাণী দেন।

এর আগে ২৫ জুন ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং ৯ জুন মরক্কোর নতুন রাষ্ট্রদূত লালা বুতাইনা এল কেরদুদি এল কুলালির পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার কোনো সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বঙ্গভবন বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে ২৭ জুন জাতীয় সংসদে সফরের অর্জন নিয়ে বক্তব্য দিলেও রাষ্ট্রপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার তথ্য সামনে আসেনি। সাধারণত বিদেশ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এবার সেই তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় রাজনৈতিক মহলের একাংশ রাষ্ট্রপতি ও সরকারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করছে।

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর দায়িত্ব ছাড়তে আগ্রহী। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বিদায় নিতে আগ্রহী। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই।’ কেন এমন সিদ্ধান্ত, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ভালো লাগে না।’

একই সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজেকে কোণঠাসা করে রাখা, বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন থেকে তার ছবি সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গভবনের প্রেস উইংয়ের কার্যক্রম সংকুচিত করার ঘটনায় অপমানবোধের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও তখন তিনি পদত্যাগ করেননি।

পরবর্তীতে ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির কাছেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নতুন সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা শপথ নেন। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আরেক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিএনপির সহযোগিতা তিনি শতভাগ পেয়েছেন এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় দলটির ভূমিকার প্রশংসাও করেন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। তবে একই বছরের ১৯ অক্টোবর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। এ বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার পদত্যাগ দাবি করে এবং বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভও হয়। সে সময় বিএনপি সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা তুলে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিরোধিতা করেছিল।

পরে ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর পর জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।

সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্র পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে এ দায়িত্বে রয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। একই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি শপথ নেন। পদত্যাগ না করলে তার সাংবিধানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে।

এএন