আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: পুলিশের করণীয় ও প্রশাসনের ভূমিকা

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৫, ০৬:০৩ পিএম
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: পুলিশের করণীয় ও প্রশাসনের ভূমিকা

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সরকারের পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ ভেবেছিল নতুন প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। 

কিন্তু বাস্তব চিত্র তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, মব জাস্টিসসহ নানা অপরাধ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, আর এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ বাহিনীর হতাশা ও পেশাগত সংকট

৫ আগস্টের ঘটনার পর পুলিশ বাহিনীর একটি বড় অংশ হতাশায় ভুগছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বহু পুলিশ সদস্য হামলা, মামলা ও হামলার শিকার হন। 

একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, `আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তার নির্দেশেই আইন প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় আমাদের ওপর নানা দোষ চাপানো হয়। কখনো চাকরির হুমকি, বদলি, আবার কখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। এতে বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে।‘

তিনি আরও বলেন, পুলিশের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনর্গঠন করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু তা করতে গেলে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিগত সমর্থন দরকার।

আইনশৃঙ্খলার অবনতি: ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

রাজধানীসহ সারাদেশের ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ব্যবসায়ী সেলিম জামান আমার সংবাদকে বলেন, `আমরা ভেবেছিলাম গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু এখন চাঁদাবাজি, ছিনতাই আরও বেড়েছে। আমাদের দোকান ও গুদামে বারবার চুরি হচ্ছে। ব্যবসা করার মতো পরিবেশ নেই। সরকারের কাছে অনুরোধ করব যেন আমরা ঝুঁকিমুক্তভাবে ব্যবসা করতে পারি।‘

তার মতে, নিরাপত্তা না থাকলে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত ভ্যাট ও কর প্রদানেও অনাগ্রহী হয়ে পড়বেন, যা রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।

অপরাধ বাড়ার কারণ কী?

অপরাধবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাম্প্রতিক অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক মন্তব্য করেন, `দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, ক্ষমতার লড়াই, ও অতীতের হামলা-মামলায় জর্জরিত অবস্থা মিলিয়ে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। অনেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হচ্ছে।‘

এছাড়া মাদক ব্যবসা, স্থানীয় দখলবাজি ও জমি নিয়ে বিরোধসহ নানা কারণে সহিংসতা বাড়ছে বলে জানা যায়।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, দেশে আইনশৃঙ্খলার কিছুটা অবনতি হয়েছে এবং এ বিষয়ে পুলিশ ও প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অপরাধীরা চিহ্নিত হয়ে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হয়।

পুলিশের করণীয় ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী বর্তমানে সীমিত জনবল ও সম্পদ নিয়ে কাজ করছে। অপরাধ প্রতিরোধে তারা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে, তবে তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, `আইনশৃঙ্খলা উন্নত করতে হলে শুধু পুলিশি অভিযান নয়, বিচার বিভাগের দ্রুত রায়, স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং জনগণের সহায়তা প্রয়োজন। আমরা যদি তথ্য পাই, অপরাধীদের ধরতে বেশি সময় লাগে না।‘

পুলিশ বাহিনী এখন অপরাধ দমন ছাড়াও সাইবার ক্রাইম, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ, সড়ক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমাবেশে শৃঙ্খলা রক্ষার মতো বহু দায়িত্ব একসাথে পালন করছে। এতে তাদের উপর চাপ বাড়ছে।

প্রশাসন ও সরকারের ভূমিকা

আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় করে তোলা, থানাগুলোতে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া এসব পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি উন্নত হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশি কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কোনো দল বা গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে।

জনসচেতনতা ও সহযোগিতা

অপরাধ দমনে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। প্রত্যক্ষদর্শীরা যদি অপরাধীদের তথ্য দিতে সহযোগিতা করেন, পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে। কমিউনিটি পুলিশিং, সিসিটিভি স্থাপন, পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বাড়ানো অপরাধ কমাতে কার্যকর হতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকার, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। বিচার বিভাগকে দ্রুত বিচার কার্যকর করতে হবে।

পুলিশ বাহিনীর মনোবল বাড়াতে পুরস্কার ব্যবস্থা, নিরাপদ চাকরির নিশ্চয়তা ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ জরুরি।

মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস দমনে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা অপরাধ প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।

উল্লেখ্য, গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি নিরাপদ সমাজ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। কিন্তু অপরাধের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের সেই প্রত্যাশায় ভাটা ফেলেছে। এখনই সময় পুলিশ বাহিনীকে মনোবল ফিরিয়ে এনে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করে, তাদেরকে প্রকৃত অর্থে আইনশৃঙ্খলার রক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার। সরকার ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই পারে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং নাগরিকদের মাঝে নতুন আস্থা তৈরি করতে।

এইচআর/ইএইচ