বর্তমান সমাজে প্রেম, সম্পর্ক ও পারিবারিক বন্ধনের ধরণ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে সম্পর্ক গড়ে ওঠা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সম্পর্ক ভাঙনের ঘটনাও বেড়েছে। এর সঙ্গে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রেম ও পরকীয়াজনিত হত্যা।
সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, প্রেমে প্রত্যাখ্যান, পরকীয়ার সন্দেহ, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা সম্পর্কের দ্বন্দ্ব থেকে সংঘটিত হচ্ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। প্রশ্ন হলো, কেন দিন দিন মানুষ প্রেমসংক্রান্ত বিষয়ে এত বেপরোয়া হয়ে উঠছে?
প্রেম মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। কিন্তু যখন সেই আবেগ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখন তা বিপজ্জনক রূপ নিতে পারে। বর্তমানে অনেক সম্পর্ক গড়ে উঠছে খুব দ্রুত, কিন্তু পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মানসিক পরিপক্বতার অভাবে সেগুলো টেকসই হচ্ছে না।
অন্যদিকে বিবাহিত জীবনে অবিশ্বাস, মানসিক দূরত্ব ও অসন্তুষ্টি থেকে পরকীয়ার জন্ম হচ্ছে। পরকীয়া যখন প্রকাশ পায়, তখন পরিবারে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব, অপমান ও প্রতিশোধের মানসিকতা। এই পরিস্থিতি অনেক সময় হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধে রূপ নেয়।
অনেক তরুণ, তরুণী সম্পর্ককে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেয়। প্রেমে ব্যর্থতা বা বিচ্ছেদ তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। ফলে হতাশা, রাগ ও প্রতিশোধের মনোভাব থেকে সহিংসতা জন্ম নেয়। মানসিক স্থিতিশীলতার অভাব মানুষকে অল্পতেই উগ্র করে তোলে।
ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে সহজে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। আবার একইভাবে ভুল বোঝাবুঝি, গোপন সম্পর্ক ও প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে। অনেক সময় ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়, যা সম্পর্কের মধ্যে ভয় ও সংঘাত তৈরি করে। এসব কারণ থেকে অনেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে।
আগে পরিবারে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ শেখানো হতো বেশি। বর্তমানে ব্যস্ত জীবনযাত্রা ও পারিবারিক দূরত্বের কারণে অনেকেই সঠিক দিকনির্দেশনা পায় না। ফলে সহনশীলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক সম্মানের মতো গুণাবলি কমে যাচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা সাধারণত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। প্রেম বা পরকীয়াজনিত দ্বন্দ্বে তারা সহজেই সহিংস হয়ে ওঠে। অনেক হত্যাকাণ্ডে দেখা যায়, অপরাধের পেছনে মাদক বা অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
সমাজের একটি অংশ এখনও নারীর স্বাধীন মতামতকে মেনে নিতে পারে না। প্রেমে প্রত্যাখ্যানকে তারা অপমান হিসেবে দেখে। ফলে আমাকে না পেলে কাউকে পাবে না ধরনের মানসিকতা থেকে অ্যাসিড নিক্ষেপ, হত্যা বা আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। অনেক সময় অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পায় না। দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। ফলে তারা ভাবতে শুরু করে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
প্রেমসংক্রান্ত হত্যা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি পুরো সমাজের জন্য হুমকি। এর ফলে পরিবার ভেঙে যায়, শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং সমাজে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস কমে যায়।
শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহনশীলতা, আত্মসম্মান ও মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। পরিবারে খোলামেলা আলোচনা ও মানসিক সমর্থন বাড়ানো জরুরি। প্রেমে ব্যর্থতা জীবনের শেষ নয়, এই বিষয়টি তরুণদের বোঝাতে হবে। প্রয়োজনে পরামর্শ বা কাউন্সেলিং ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
অনলাইনে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি শেয়ার করার আগে সচেতন হতে হবে। প্রেম ও পরকীয়াজনিত সহিংসতার ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিলে ভবিষ্যতে অপরাধ কমতে পারে। ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে আত্মসংযম ও মানবিক আচরণের গুরুত্ব বোঝাতে হবে।
প্রেম মানুষের জীবনের সুন্দর একটি অনুভূতি, কিন্তু তা যখন নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ, প্রতিশোধ ও স্বার্থপরতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রেম ও পরকীয়াজনিত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক অস্থিরতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার অভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে একটি নিরাপদ সমাজ গঠন সম্ভব।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন