বর্তমান যুগে ফেসবুক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আয়-উপার্জনেরও একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
অনেকেই আজ ফেসবুক ব্যবহার করে কনটেন্ট তৈরি, ব্যবসা প্রচার, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, বিজ্ঞাপন কিংবা অনলাইন শপ পরিচালনার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন।
সত্যি বলতে কি, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি কর্মসংস্থান তৈরির একটি ভালো সুযোগ।
কিন্তু বাস্তবে ফেসবুক থেকে আয় করা কি এতই সহজ! আমার বোঝা মতে মোটেও সহজ নয়। নিয়মিত মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করা, দর্শককে আকৃষ্ট করা, ফলোয়ার বাড়ানো এবং ফেসবুকের কঠোর নীতিমালা মানা—এসবই অনেক সময় ও পরিশ্রম দাবি করে।
অনেকেই দীর্ঘ সময় চেষ্টা করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পান না। অ্যালগরিদম পরিবর্তন, ভুয়া অনুসারী, কিংবা মনিটাইজেশনের শর্ত পূরণে ব্যর্থতা—এসব কারণে অনেকের বহুদিরেন চেষ্টা কষ্ট পুরোই বৃথা হয়ে যায়। ফলে এটি শুধু সহজ টাকা রোজগারের রাস্তা নয়, বরং ধৈর্য, কৌশল ও পরিশ্রমের একটি ক্ষেত্র।
বেশকিছু দিন ফেসবুকের এই ইনকামের বিষয়টা মাথায় খুব ঘুর ঘুর করছে। তবে ইনকাম করার জন্য নয়, মানুষ যেভাবে ইনকাম করার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সেটা। লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, লাইভের নেশায় ছেলে বুড়ো, নারী, শিশু, ঘরের মেয়ে-বউ, ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে তাতে বিষয়টি আমার কাছে খুব অ্যালার্মিং মনে হচ্ছে। আর একটা বিষয় হলো মডেলিং এবং ফ্যাশন ডিজাইন এই জিনিসগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে একেবারে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পেরেছে।
এক শ্রেনিতো একেবারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য নিষিদ্ধ এবং গোপনীয় বিষয়গুলোকে উন্মুক্ত করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যা খুবই দৃষ্টিকটু। মুরুব্বি বা বাচ্চাদের সামানে ফেসবুক ওপেন করা রীতিমতো ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারো কারো হয়তো এই লেখায় মনক্ষুণ্ন হতে পারে, প্রকৃতপক্ষে কাউকে আঘাত করার জন্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ লেখা নয়। আমার কাছে বিষয়টি খুবই উদ্বেগের মনে হচ্ছে। আমরা যদি ধর্মীয় দিক বিবেচনা করি, তাহলে ভেবে দেখেন হয়তো আপনার স্ত্রী বা মেয়ের যে পুরুষের সাথে কোনদিন কোনোভাবেই দেখা হতো না, নামই জানতো না। যার বউকে আপনি কোনদিনও চিনতেন না। তাকে আপনি প্রতিদিন দেখছেন। যেভাবে দেখা যেত না সেভাবেও দেখছেন! আর যারা মডেলিং ও ফ্যাশনকে ঘরে নিয়ে গিয়েছে তাদের কথাতো বাদ, তারাতো নিজেকে আকর্ষণীয় এবং মোহনীয় করেই উপস্থাপন করছেন। অনেকে পাগলই হয়ে গিয়েছে, কি করছে, কি পোস্ট করছে, কি বলছে, কি লিখছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
আর ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে যদি বলি। ইনকামের আশায় অনেকেই সেটা জলাঞ্জলি দিয়েছে, তার ব্যক্তিত্বের সাথে এটা যায় না, তাও সে সেটা করছে। একজন লোক চলনে বলনে বেশ ভুশায় সব কিছু পুরাই ইসলামিক কিন্তু ইনকামের আশায় উনি এমন কিছু করছেন যা তার সাথে বেমানান। উনি হয়তবা সেটা বুঝতেও পারছেন না।
অনেকের এই ধরনের ভিউ বাড়ানোর পোস্টের জন্য অহংকার, অহমিকা, ধনীত্ব, বড়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে। এটা কি ইসলাম সমর্থন করে? আজকে কি কি খেয়েছেন- লোভনীয় সব খাবারের ছবিসহ পোস্ট করে দিলেন। ঘরে কি কি রান্না হয়েছে লোভনীয় সুন্দর সুন্দর খাবার সব পোস্ট করে দিলেন। এটাতো সারাদেশজুড়ে অনেকেই দেখছেন, একবারও ভেবেছেন এর মধ্যে অনেকেই আছে যার কাছে খাবারটি কাঙ্ক্ষিত কিন্তু কিনতে পারছে না। এমন লোকও থাকতে পারে যে ঐদিন তার বাসায় খাবারই নেই! চমৎকার চমৎকার দামি ড্রেস পোস্ট দিলেন, অনেকের বাচ্চা তার বাবার কাছে একটি নতুন ড্রেসের জন্য বায়না করে বহুদিন অপেক্ষা করছে। বাবা দিতে পারছে না, বাচ্চাও পাচ্ছে না- তারাওতো আপনার পোস্টটি দেখেছে, হয়তো সে আপনার আত্মীয়।
কী আলিশান বাড়ি করেছেন ভাই। কি চমৎকার ফ্ল্যাট। কী সাজ সজ্জা। দামি দামি ফার্নিচার! পোস্ট করে দিলেন। একবারও ভেবেছেন অনেকেই এসব করতে পারছে না। এমনকি অনেকেই আছেন আপনার আত্মীয় বা ফেসবুক ফ্রেন্ড তার সাথে বাড়িওয়ালা জঘন্য ব্যবহার করেছে অল্প কয়টা টাকা বাড়ি ভাড়া বাকি আছে বিধায়। এগুলো কী অহংকার, অহমিকা, ধনীত্বর প্রচার নয়! আবার এমনও আছে সে কিসে চাকুরি করে কয় টাকা বেতন পায় সবাই জানে কিন্তু যে বাড়ি বা ফ্লাটের পোস্ট দিচ্ছে তা তার সারা জীবনের বেতন দিয়েও কেনা সম্ভব নয়। ভাবে না যে মানুষ কি ভাববে, আমি এটা কীভাবে কিনলাম! আরে ভাই সারা জীবন দুই নাম্বারী টাকা ইনকাম করছে, ঘুষ খেয়ে খেয়ে বাড়ি গাড়ি সবই করছে সর্বজন স্বীকৃত। এরপরে গেছে হজ্জ করতে বা উমরা করতে। প্রতিদিন পোস্ট দেয় আজকে এই করলাম, কালকে এই করলাম। আরে পরিচিত মানুষের যখন চোখে পড়ে মানুষ তখন কি ভাবে, দোয়া করে! উল্টা গালি দেয়।
ভিউ বাড়ানোর নেশায় অনেকের দেখলাম হয় তার ভাগনী বা খালা বা ফুফু, দেখতে সুন্দর, আকর্ষণীয় বেশ তার সাথে ছবি একটা তুলে দিয়ে দিল। এমন পোজ মনে হয় যে নায়ক নায়িকা। ভাল ব্যক্তিত্ববান লোক, সুযোগ পেয়েছে একটু খোলামেলা বা দৃষ্টিকাড়া পোশাকে কোন পরিচিত নারী বা সেলিব্রেটি বেশ একটা ফটো তুলে দিয়ে দিল। আমাদের একটু এসব জায়গায় ভাবা দরকার।
আমাদের দেশে মানুষ একেবারে ফেসবুকের ইনকামের প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, বিশেষ করে অনেক নারী সংসারের দায়িত্ব অবহেলা করে ফেসবুকে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন, যা পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করছে।
লজ্জাশীলতা বজায় রাখা, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ফেসবুকের কারণে কেউ লজ্জাহীন হয়ে পড়ে বা সংসারের প্রতি উদাসীন হয়, তবে তা ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়।
ফেসবুক থেকে আয় করা সম্ভব এবং এটি নতুন প্রজন্মের জন্য সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে। তবে একে সহজ মনে না করে কঠোর পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও ধৈর্যের সাথে চেষ্টা করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ফেসবুক ব্যবহার যেন আদর্শ, লজ্জাশীলতা, পরিবারের দায়িত্ব এবং নৈতিকতার ক্ষতি না করে—এটা নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক নিয়তে ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে ফেসবুক উপকারী হবে, আর ভুল পথে ব্যবহার করলে এটি দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
***মতামত লেখকের নিজস্ব
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন