রোহিঙ্গা সমস্যা: সমাধানের পথ ও বাংলাদেশের করণীয়

মতামত ডেস্ক প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৫, ০৬:৪৭ পিএম
রোহিঙ্গা সমস্যা: সমাধানের পথ ও বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশ গত সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকট রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলা করে চলেছে। 

২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নিপীড়ন ও জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে প্রায় বারো লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে ওঠা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরগুলো এখন বাংলাদেশের কাঁধে বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। 

খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা সব খাতে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি এক গভীর সংকট তৈরি করছে।

সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন এখনই রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান না করা গেলে এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে রূপ নেবে। 

তিনি উল্লেখ করেন, আশ্রিত রোহিঙ্গারা হতাশ হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে, অনেকেই মাদক পাচার, চোরাকারবারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যাচ্ছে।

সমস্যা আরও গভীর হচ্ছে

বাংলাদেশ শুরু থেকেই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এত বিপুল জনসংখ্যা বছরের পর বছর ধরে ধরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রতিবছর রোহিঙ্গা শিবিরে জন্ম হচ্ছে হাজার হাজার শিশু। কিন্তু পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের কোনো সচেতনতা নেই। ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়েই চলেছে।

একইসঙ্গে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বড় অংশ বেকার, কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। হতাশা ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারি ও অস্ত্র ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবহার করছে। 

বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্তবর্তী এলাকায় ইয়াবা পাচার এখন বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের করণীয়

এই জটিল সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে একদিকে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো: রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান মিয়ানমারে। তাদের নিজ দেশে নাগরিকত্ব প্রদান ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ছাড়া এই সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান নেই। এজন্য বাংলাদেশকে জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ান, এমনকি চীন ও ভারতের ওপরও কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে। 

জাতিসংঘের ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা যথার্থই বলেছেন, বিদেশি সহায়তা ছাড়া এ সমস্যার সমাধান কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক মহলকে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।

মানবিক সহায়তার ধারাবাহিকতা: জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা ক্রমেই কমছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের দরজায় আরও জোরালোভাবে কড়া নাড়তে হবে। রোহিঙ্গাদের মানবিক চাহিদা পূরণ না হলে তারা আরও অস্থির ও বিপথগামী হয়ে পড়বে।

আইনশৃঙ্খলা জোরদার করা: রোহিঙ্গাদের অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়া রুখতে নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। সীমান্তে কঠোর নজরদারি, মাদক চোরাচালান বন্ধ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষা ও সচেতনতা: রোহিঙ্গা শিশু-কিশোররা শিক্ষার বাইরে থাকলে অচিরেই তারা বিপজ্জনক পথে চলে যাবে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় শরণার্থী ক্যাম্পে শিক্ষা কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রচারণা চালাতে হবে।

বিকল্প পরিকল্পনা: যেহেতু শিগগিরই তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, তাই অন্তত অস্থায়ী সমাধান হিসেবে ভাসানচর প্রকল্পের মতো পরিকল্পনা আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এতে কক্সবাজারের জনসংখ্যার চাপ কিছুটা কমবে এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সহজ হবে।

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের একক দায়িত্ব নয়; এটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু অনন্তকাল ধরে এই বোঝা বহন করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা সঠিকভাবেই বিশ্বকে সতর্ক করেছেন—এখনই সমাধান না হলে রোহিঙ্গারা শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

বাংলাদেশের করণীয় হলো কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা এবং মানবিক দায়িত্ব অব্যাহত রাখা। একইসঙ্গে বিশ্ব সম্প্রদায়কে অবশ্যই বুঝতে হবে—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ছাড়া কোনো সমাধান নেই। এ সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এটি আঞ্চলিক অশান্তি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

ইএইচ