আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। তারা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে অজানা ভূমিতে, অচেনা ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝে, কঠোর পরিশ্রম করে বিদেশি মুদ্রা দেশে পাঠান। তাদের এই ঘাম, ত্যাগ আর ভালোবাসায় আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল। সরকার, অর্থনীতি ও সমাজ— সবক্ষেত্রেই তাদের অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রবাসী শ্রমিকদের ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ষাট ও সত্তরের দশকের শেষ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাঙালি গিয়ে কাজ শুরু করেন। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা ব্যবসায়ী-তারা সবাই একসঙ্গে এক নামে পরিচিত- রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো অর্থবছরে এত প্রবাসী আয় আসেনি। এই অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে, ব্যাংকিং খাত সমৃদ্ধ হয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকে। গ্রামে নতুন বাড়ি তৈরি হয়, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ হয়, কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ে।
এই প্রবাসী আয় দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) একটি বড় অংশ দখল করে আছে। অনেক অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘রেমিট্যান্স হচ্ছে বাংলাদেশের জীবনরস।’
যখন দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে ধীরগতি আসে, তখন এই প্রবাসীদের পাঠানো টাকাই অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখে। তারা বিদেশের নির্মাণসাইটে, গরম মরুভূমিতে, ঠাণ্ডা বরফেঢাকা দেশে, কিংবা সমুদ্রযাত্রায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। তাদের পাঠানো প্রতিটি ডলার, প্রতিটি রিয়াল বা দিনার-দেশের অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটায়।
কিন্তু এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনের গল্পগুলো সবসময় এত আলোয় ভাসে না। প্রবাসের জীবন মানেই একাকিত্ব, অজানা কষ্ট, পরিবার থেকে দূরে থাকা, সামাজিক নিঃসঙ্গতা। অনেক শ্রমিক প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন, কোনো বিশ্রাম নেই, নেই স্থায়ী নিরাপত্তা।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনেক প্রবাসী কর্মীকে মানবাধিকার বঞ্চিত অবস্থায় কাজ করতে হয়।
তাদের কেউ-কেউ প্রতারণার শিকার হন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে। উচ্চ খরচে বিদেশে গিয়ে কাজ না পাওয়া, বেতন বন্ধ থাকা, বা অমানবিক আচরণের শিকার হওয়া— এসব গল্প এখন আর নতুন নয়।
যে মানুষ নিজের পরিবারকে সুখ দিতে গিয়ে বিদেশে পাড়ি দেন, সেই মানুষকেই অনেক সময় দেশে ফেরার পর ভুলে যায় সমাজ। রেমিটেন্সের টাকাটা যদি সঠিক পথে আসে, অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসে, তাহলে রাষ্ট্রের জন্য তা আশীর্বাদ। কারণ বৈধ চ্যানেলে পাঠানো অর্থে সরকার বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে পারে, যার মাধ্যমে বাজেট স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনো বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডি বা অবৈধ পথে দেশে আসে।
এই অবৈধ লেনদেন শুধু রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, প্রবাসীর কষ্টার্জিত অর্থকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। অনেক সময় হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো টাকা প্রাপকের কাছে না পৌঁছে যায় অন্যের হাতে। অতএব, প্রবাসীদের জন্য সহজ, নিরাপদ ও দ্রুত ব্যাংকিং চ্যানেল নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সরকার ইতোমধ্যে প্রবাসী আয় বাড়াতে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে—যেমন ২.৫ শতাংশ ইনসেনটিভ। কিন্তু শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, এর সঙ্গে দরকার মানবিক প্রণোদনা— তাদের মর্যাদা, স্বীকৃতি ও সম্মান নিশ্চিত করা।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব বহুমুখী
প্রথমত, বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স কঠোরভাবে তদারকি করা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো আধুনিক করা এবং শ্রমিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় দ্বিপাক্ষীয় চুক্তি জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে শুধু কূটনৈতিক অফিস নয়, প্রবাসী সেবাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে হবে।
তৃতীয়ত, দেশে ফেরার পর তাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে—যাতে তারা নিজেদের সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন, উদ্যোক্তা হতে পারেন।
চতুর্থত, প্রবাসী সন্তানদের শিক্ষার জন্য বিশেষ তহবিল, স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার এবং সম্মানজনক পুরস্কার প্রবর্তন করা যেতে পারে।
আমরা প্রায়ই দেখি, দেশের মেধাবীরা যারা দেশে থেকে চাকরি বা ব্যবসা করেন, তারা সমাজে সম্মান পান। কিন্তু প্রবাসীরা, যারা তাদের কষ্টের টাকা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখেন, তাদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ততটা সহানুভূতিশীল নয়। অনেকে তাদের ‘বিদেশ ফেরত’ বলে ব্যঙ্গ করেন, অথচ বাস্তবে তারাই দেশের বীর। রাষ্ট্র যদি বছরে একবার ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা দিবস’ পালন করে, বিদেশফেরত সফল প্রবাসীদের সম্মাননা দেয়, তবে তা নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
বর্তমানে নারী প্রবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু তারা প্রায়ই নির্যাতন, হয়রানি ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হন। তাদের সুরক্ষায় সরকারকে আরও দৃঢ় হতে হবে। বিদেশে পাঠানোর আগে ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনগত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। রেমিট্যান্স কেবল শ্রমিকদের নয়, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের কাছ থেকেও আসে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, কাতার ও সৌদি আরবে অসংখ্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ী দেশীয় বিনিয়োগে অংশ নিচ্ছেন।
তারা কেবল টাকা পাঠান না, জ্ঞান, প্রযুক্তি ও নেটওয়ার্কও দেশের উন্নয়নে কাজে লাগান।
রাষ্ট্র চাইলে এই প্রবাসী উদ্যোক্তাদের নিয়ে ডায়াসপোরা ইনভেস্টমেন্ট বোর্ড গঠন করতে পারে, যাতে বিদেশে অবস্থানরত সফল বাংলাদেশিরা দেশে সহজে বিনিয়োগ করতে পারেন।
প্রবাসী শ্রমিকরা কখনো ঈদ, কখনো পহেলা বৈশাখ, কখনো সন্তানের জন্মদিনও দেশে এসে উদযাপন করতে পারেন না। তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো কাটে পরদেশে, অচেনা মুখদের মাঝে।
তবুও তারা প্রতিদিন ব্যাংকের কাউন্টারে টাকা পাঠান-একটাই উদ্দেশ্যে, পরিবার ভালো থাকুক, দেশ এগিয়ে যাক।
তাদের চোখে দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির প্রতি টান, এবং পরিবারের প্রতি- দায়বদ্ধতাএই তিনটিই তাদের জীবনের চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এই যাত্রায় রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান অপরিসীম।
কিন্তু তাদের অবদান টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও ডিজিটাল করতে হবে। হুন্ডি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোকে শ্রমিকবান্ধব করতে হবে। দেশে ফেরার পর প্রবাসীদের পুনর্বাসন ও বিনিয়োগ সহায়তা বাড়াতে হবে। প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
রেমিট্যান্স যোদ্ধারা শুধু অর্থ পাঠান না—তারা পাঠান দেশের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ আর আত্মত্যাগের বার্তা। তাদের পরিশ্রমে গড়ে ওঠে গ্রামের নতুন ঘর, শহরের নতুন কারখানা, রাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক গতি।
অতএব, তাদের সম্মান করা মানে নিজের দেশকে ভালোবাসা। রাষ্ট্র যদি এই প্রবাসীদের স্বপ্নের সাথী হয়, তবে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রা হবে আরও শক্তিশালী, আরও মানবিক।
তাদের প্রেরিত প্রতিটি ডলার, প্রতিটি রিয়াল-একটি শিশুর মুখে হাসি, একটি পরিবারের আশার আলো এবং একটি দেশের গর্বের প্রতীক। তাই আমরা বলতে চাই, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির সৈনিক, তাদের সম্মানই রাষ্ট্রের মর্যাদা।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন