বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আজ শিল্পখাত। তৈরি পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, রাসায়নিক, কাগজ, ইলেকট্রনিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ এই শিল্পখাতকে করেছে দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে আজ এক ভয়াবহ বাস্তবতা দাঁড়িয়ে গেছে একটির পর একটি শিল্পকারখানা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য শ্রমিক, ধ্বংস হচ্ছে দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক আস্থা।
গত কয়েক মাসেই দেখা গেছে ঢাকার গাবতলী, আশুলিয়া, সাভার, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। কোনো গার্মেন্টস কারখানায় রাতে কাজ চলাকালীন আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভবন, কোথাও কেমিক্যাল গুদামে বিস্ফোরণে আহত হচ্ছে শতাধিক শ্রমিক, আবার কোথাও বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ভবনে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট ২৬,৬৫৯টিরও বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যার মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই সব ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আনুমানিক চার হাজার কোটি টাকারও বেশি, এবং প্রাণহানি ঘটেছে শতাধিক শ্রমিকের।
আগুনের উৎপত্তি কোথায়?
তদন্ত প্রতিবেদনগুলো বলছে, আগুনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অবহেলা, অপরিকল্পিত স্থাপনা, নিরাপত্তা নীতিমালা না মানা, পুরোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ ও রাসায়নিক পদার্থের অব্যবস্থাপনা।
অনেক কারখানায় এখনো পর্যন্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও তা অকেজো, নিয়মিত পরিদর্শন হয় না, এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানে জরুরি নির্গমন পথই নেই।
যেসব ভবন মূলত আবাসিক হিসেবে নির্মিত, সেগুলোকেই পরবর্তীতে শিল্প ব্যবহারের জন্য রূপান্তর করা হয়। ফলে সামান্য একটি শর্ট সার্কিটই মুহূর্তে রূপ নেয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে।
বিশেষ করে পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক পদার্থ ও দাহ্য বস্তু রাখার কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। ২০১০ সালের নিমতলীর ভয়াবহ আগুন, ২০১৯ সালের চকবাজার ট্র্যাজেডি, কিংবা সাম্প্রতিক সীতাকুণ্ড বিস্ফোরণ এসবগুলো ঘটনার পেছনে রয়েছে একই কারণ: দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণহীন কেমিক্যাল ব্যবসা।
এর দায় কার?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, কিন্তু দায় এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। কারন দায় শিল্পমালিক, স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়—সব পক্ষের।
ফ্যাক্টরির অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদানে যেসব সংস্থা যুক্ত, তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও দুর্নীতির সুযোগে অনেক অবৈধ কারখানা বছরের পর বছর চলতে থাকে। অনেকে ‘ঘুষে’ পরিদর্শন রিপোর্ট ঠিকঠাক করিয়ে নেন। ফলে দুর্ঘটনার পর দেখা যায়, কাগজে-কলমে সবই নিয়মমাফিক, অথচ বাস্তবে কারখানার কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভঙ্গুর।
তদন্ত কমিটি হয়, সংবাদ সম্মেলন হয়, কিন্তু দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি হয় না। আগুন নেভার সঙ্গে সঙ্গেই তদন্তের আগ্রহও যেন নিভে যায়। এভাবেই প্রতিটি ঘটনা পরিণত হয় কাগুজে প্রতিবেদনে, আর পরের মাসেই আবার নতুন কোনো স্থানে আগুনের খবর আসে।
শ্রমিকদের দুর্দশা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
অধিকাংশ শ্রমিকই জানেন না কীভাবে আগুন লাগলে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। কারখানার ভেতরে সুরক্ষা প্রশিক্ষণ, অগ্নি মহড়া, বা জরুরি অবস্থার মহড়া খুব কমই হয়। আর অনেক সময় ভবনের ভেতরে দরজাগুলো তালাবদ্ধ থাকে, যাতে শ্রমিকরা অনুমতি ছাড়া বের হতে না পারে, ফলে আগুনের সময় তারা আটকা পড়ে যায়। ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের হাশেম ফুড কারখানায় এমনই এক ঘটনায় ৫২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। তারা বের হতে পারেননি, কারণ দরজাগুলো বাইরে থেকে বন্ধ ছিল।
এমন দুর্ঘটনা শুধু মানবিক ট্র্যাজেডিই নয়, এটি শ্রমবাজারে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। যারা বেঁচে যান, তাদের অনেকেই দগ্ধ হয়ে আজীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারান। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ অপর্যাপ্ত বা বিলম্বিত হয়। শ্রমিকের জীবন যেন এখনো সবচেয়ে সস্তা, সবচেয়ে অবহেলিত সম্পদ।
অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের ক্ষতি
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি যোগান দেয়। এই খাতের নিরাপত্তা মান আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজেন ভারত, ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকেন। তাই প্রতিটি আগুন শুধু একটি ভবন নয়, একটি দেশের ভাবমূর্তি ও বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে।
প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পর ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর পুনর্গঠন, শ্রমিক পুনর্বাসন ও রপ্তানি আদেশ পূরণে বিলম্বের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, প্রতিযোগিতায় দুর্বল হয়ে পড়ে আমাদের শিল্পখাত। এভাবে একের পর এক দুর্ঘটনা দেশকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রশাসনিক দুর্বলতা ও নীতিগত ফাঁক
বাংলাদেশে অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুযায়ী প্রতিটি শিল্প ভবনে নির্দিষ্ট অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানই তা মানে না।
স্থানীয় সরকার ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন প্রক্রিয়া বহু ধাপের, জটিল এবং অনেক সময় অকার্যকর। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ উপেক্ষা করেই ভবন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতি ও আইনের শিথিল প্রয়োগই এই অব্যবস্থার প্রধান কারণ।
শিল্প নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ: যেসব কারখানা অগ্নি নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলে না, তাদের উৎপাদন বন্ধ রাখা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দায়ী ব্যক্তিদের নাম গোপন না রেখে প্রকাশ করতে হবে।
কেমিক্যাল গোডাউন পুনর্বাসন: পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দাহ্য পদার্থের গুদামগুলো অবিলম্বে শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করতে হবে। এই বিষয়ে সরকার ২০১৯ সালেই পরিকল্পনা নিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন আজও অসম্পূর্ণ।
নিয়মিত অগ্নি মহড়া ও শ্রমিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা: প্রতি তিন মাস অন্তর শ্রমিকদের নিয়ে অগ্নি মহড়া আয়োজন করতে হবে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং দুর্ঘটনার সময় প্রাণহানি কমবে।
ফায়ার সার্ভিস আধুনিকীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: ফায়ার সার্ভিসকে কেবল শহর নয়, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক আলাদা ইউনিটে সম্প্রসারণ করতে হবে। উন্নত যন্ত্রপাতি, রোবটিক রেসকিউ সিস্টেম, অগ্নি শনাক্তকরণ ড্রোন ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার জরুরি।
লাইসেন্স ও পরিদর্শন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা: শিল্প অনুমোদনে দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি কারখানার নিরাপত্তা তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে।
মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের তদারকি জোরদার করা: দুর্ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও নাগরিক উদ্যোগ এই সমস্যা দৃশ্যমান রাখে। রাষ্ট্রের উচিত এই ভূমিকা উৎসাহিত করা, দমন নয়।
আগুন কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের অবহেলা, দুর্নীতি ও দায়হীনতার প্রতিফলন।
প্রতিবার আগুনের পর শোক, তদন্ত, আশ্বাস, তারপর ভুলে যাওয়া। কিন্তু যে পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে, তাদের জন্য এই আগুনের দগদগে স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
দেশের শিল্প কেবল অর্থনীতির প্রতীক নয়, এটি শ্রমিকের রক্ত ও ঘামের প্রতিফলন। অতএব, অগ্নি নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, এটি মানবিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার অংশ।
যেদিন এই দায়বোধ আমাদের প্রশাসন, শিল্পমালিক ও নাগরিক সমাজে জাগ্রত হবে, সেদিনই থামবে এই অগ্নি-দুর্বিপাক।
শিল্পের উন্নয়ন তখনই সত্যিকার অর্থে টেকসই হবে, যখন তা শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেবে।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন