প্রাইভেট হাসপাতাল: চিকিৎসা নয় চলে টেস্ট বাণিজ্য

হাশেম রেজা প্রকাশিত: অক্টোবর ২০, ২০২৫, ০৩:১৬ পিএম
প্রাইভেট হাসপাতাল: চিকিৎসা নয় চলে টেস্ট বাণিজ্য

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ এমন এক সংকটে পড়েছে, যেখানে জীবন রক্ষার স্থান, হাসপাতাল অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে মৃত্যুফাঁদ। চিকিৎসা নেওয়ার উদ্দেশ্যে মানুষ যায় আশায়, ফেরে হতাশায়। কারও ভাগ্যে থাকে ভুল চিকিৎসা, কারও জীবনের সমাপ্তি। রাজধানী থেকে জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বেশির ভাগই গড়ে উঠেছে লাইসেন্সবিহীন বা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি নিয়ে, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসা মানে নামকাওয়াস্তে আনুগত্যও নেই।

প্রশ্ন জাগে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো কারা পরিচালনা করছে, কাদের অনুমতিতে এমন ব্যবসা চলছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রোগীর জীবনের দায়ভার কার?

হাসপাতাল নয়, ব্যবসাকেন্দ্র

আজ দেশের প্রায় প্রতিটি শহর, উপজেলা, এমনকি পাড়া-মহল্লায়ও দেখা যায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল বা চেম্বার কমপ্লেক্স। ছোট্ট একটি ভবন, কয়েকটি টেস্ট মেশিন, দুই-একজন নার্স আর একটি ডাক্তার বোর্ড এভাবেই শুরু হয় ‘হাসপাতাল ব্যবসা’।

দেখতে পাবেন নাম আল হেলথ কেয়ার স্পেশালিস্ট হাসপাতাল, মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ,গ্লোবাল লাইফ ক্লিনিক নাম শুনে মনে হয় আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু ভিতরে গেলে বোঝা যায় বাস্তবতা উল্টো।

অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই নিবন্ধিত ডাক্তার, নেই অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞ, নেই সঠিক লাইসেন্স। এমনকি লাইফ সাপোর্ট বা আইসিইউ ইউনিটের নামে থাকে ভাঙা যন্ত্রপাতি, অকেজো অক্সিজেন সিলিন্ডার, অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান।

এখানে চিকিৎসা নয়, চলে টেস্টের বাণিজ্য। রোগী এলে রোগের চেয়ে আগে বলা হয় রক্ত, ইউরিন, ইসিজি, এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান যা দরকার, যা দরকার নয়, সব করতেই হবে। যেন রোগী নয়, টেস্ট করানোই মূল লক্ষ্য।

ক্লিনিক ব্যবসার অদৃশ্য সিন্ডিকেট

এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো একা নয় পেছনে আছে এক বিশাল নেটওয়ার্ক। অনেক ডাক্তার নিজেরা সরাসরি জড়িত এসব প্রতিষ্ঠানে। তারা দিনের বেলায় সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন, রাতে বসেন বেসরকারি ক্লিনিকে। অনেক সময় রোগীকে সরকারি হাসপাতাল থেকে বলে দেওয়া হয় এই টেস্টটা বাইরে থেকে করিয়ে আনুন। আর বাইরে বলতে বোঝানো হয় নিজেদের চেনা বা সংশ্লিষ্ট ক্লিনিক।

প্রতিটি টেস্টের জন্য ক্লিনিক মালিক ও সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের মধ্যে থাকে কমিশন চুক্তি। একজন রোগীর খরচ যত বাড়ে, ডাক্তারের ততই বাড়ে কমিশন। ফলে যেখানে একটি রক্তপরীক্ষাই যথেষ্ট, সেখানে দেওয়া হয় দশটি টেস্টের পরামর্শ। অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, বাংলাদেশে এখন চিকিৎসা নয়, টেস্টই চিকিৎসা।

এই সিন্ডিকেটে জড়িত অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি কেউ রাজনীতিতে, কেউ প্রশাসনে। তাই অভিযান চালালেও স্থায়ী সমাধান আসে না।

লাইসেন্স আছে, তবু নিরাপত্তা নেই

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৮ হাজার বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সে চলছে। অভিযান চলে, তালিকা প্রকাশ হয়, কয়েকদিন বন্ধ থাকে তারপর আবার খুলে যায় নতুন নামে।

এমনকি লাইসেন্সধারী হাসপাতালেও চিকিৎসা নিরাপত্তা নেই। অনেক হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার, প্রশিক্ষিত নার্স বা আইসিইউ-টেকনিশিয়ান। অনেকে সরকারের স্বাস্থ্যবিধি বা ফায়ার সেফটি নিয়মও মানে না। ঢাকা শহরে একাধিক হাসপাতাল এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে, যেখানে আগুন লাগলে প্রাণরক্ষা অসম্ভব।

ভুল চিকিৎসা: আইনের চোখে ‘ভুল’, কিন্তু কারও কি দায় নেই?

রোগীর মৃত্যু হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, ডাক্তার দায়ী। ডাক্তার বলেন, আমি তো প্রাইভেট কনসালট্যান্ট। আর প্রশাসন বলে, তদন্ত চলছে। ফলাফল হয়, কেউ দায় নেয় না, কেউ শাস্তি পায় না।

দেশে এখনো, মেডিকেল ম্যালপ্র্যাকটিস আইন, কার্যকর হয়নি। ফলে চিকিৎসা বাণিজ্যের এই দৌরাত্ম্য ঠেকানোর কার্যকর উপায় নেই। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) অভিযোগ পেলে পদক্ষেপ নেয় বটে, কিন্তু প্রমাণের জটিলতায় বেশির ভাগ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

রোগীর আস্থা ভাঙছে

একসময় মানুষ ডাক্তারকে দ্বিতীয় আল্লাহ বলে ভাবত। আজ অনেকে মনে করেন, চিকিৎসা মানে খরচের খাত। একজন দরিদ্র রোগী প্রাথমিক সর্দি-জ্বর নিয়ে যায় হাসপাতালে গেলে তাকে দেওয়া হয় টেস্টের কাগজ, ওষুধের প্রেসক্রিপশন আর বিলের পাহাড়। রোগী সুস্থ না হয়ে ফিরে আসে হতাশায়, ঋণে।

একজন বৃদ্ধা হয়তো নিজের সঞ্চয় ভেঙে বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে যান। পরীক্ষায় ধরা পড়ে কিছুই হয়নি, তবু তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।আর এই বাস্তবতাই সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম দিয়েছে প্রশ্ন, চিকিৎসা কি পণ্য হয়ে গেছে?

সরকারের নজরদারি কোথায়?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন, তিনটি সংস্থা যৌথভাবে এই হাসপাতাল, ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে। কিন্তু সমন্বয়ের অভাবে কার্যকর তদারকি নেই। কোনো এলাকায় অভিযান চালানো হলেও তার আগে খবর ফাঁস হয়ে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক আশ্রয়ে রক্ষা পায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্য খাতে এখন  লাভের লড়াই চলছে, যেখানে রোগীর জীবন গৌণ।

ডা. এমএ করিম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বেসরকারিকরণ দরকার ছিল, কিন্তু কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই খাত এখন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। রোগী এখানে ভোক্তা, চিকিৎসা একটি পণ্য।

কেন ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতাল গড়ে উঠছে? এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে জরুরি।

বিশ্লেষকরা বলেন, এর পেছনে আছে তিনটি বড় কারণ—

  • লাভজনক ব্যবসা: চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগের মুনাফা দ্রুত পাওয়া যায়। এক্স-রে, ব্লাড টেস্ট, সিটি স্ক্যান সবকিছুতেই খরচ কম, আয় বেশি।
  • নিয়ন্ত্রণহীন প্রশাসন: লাইসেন্স ও অনুমোদনের জটিলতা থাকলেও অনেক সময় যোগাযোগ,বা ঘুষ দিয়েই তা পেয়ে যায় উদ্যোক্তারা।
  • জনগণের অসহায়ত্ব: সরকারি হাসপাতালে ভিড়, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে ছুটে যায়। আর সেই সুযোগেই ব্যবসায়ীরা মুনাফা তোলে।

ডাক্তারদের ভূমিকা ও দায়

সব ডাক্তার নয়, কিন্তু কিছু সংখ্যক চিকিৎসক এই অব্যবস্থার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। অনেকেই ভিজিট শেয়ারিং নামের চুক্তিতে নির্দিষ্ট ক্লিনিকের সঙ্গে কাজ করেন। রোগী পাঠানোর বিপরীতে তাঁরা পান নির্দিষ্ট কমিশন। আর এর ফলে চিকিৎসা হয়ে পড়ে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের অংশ। অন্যদিকে, যারা সততা বজায় রাখেন, তারা এই প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেন না।

একজন সিনিয়র চিকিৎসক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, এখন ডাক্তার নয়, কমিশন চালায় চিকিৎসা। আমি নিজে এমন ক্লিনিক দেখেছি যেখানে এক্স-রে মেশিন ভাঙা, তবু রিপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। এ যেন অন্ধকার এক বাজার, যেখানে জীবনের চেয়েও বড় মূল্য টাকার।

সাধারণ মানুষের প্রতারণা ও অসহায়তা

গ্রামের মানুষ শহরে আসে ভালো চিকিৎসার আশায়। কিন্তু ঢুকে পড়ে প্রতারণার জালে। অভিভাবকরা বাচ্চার সর্দি নিয়ে আসে, আর ফিরে যায় হাতে একগাদা টেস্টের রিপোর্ট।
বৃদ্ধ রোগীকে বলে দেওয়া হয়, অপারেশন লাগবে, যা হয়তো মোটেও প্রয়োজন নেই। আর রোগীর মৃত্যু হলে বলা হয়, আল্লাহর ইচ্ছা। কিন্তু এই কথার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় হাসপাতালের অব্যবস্থা, ভুল চিকিৎসা, কিংবা মানবিক দায়িত্বহীনত।

সমাধান কোথায়

স্বাস্থ্যসেবার এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন:

  • লাইসেন্স নবায়ন ও কঠোর যাচাই: প্রত্যেক ক্লিনিক ও হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়নের সময় মান যাচাই বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • ভুল চিকিৎসা প্রতিরোধে বিশেষ আইন: মেডিকেল ম্যালপ্র্যাকটিস প্রতিরোধে কার্যকর আইন ও দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন প্রয়োজন।
  • ডাক্তারের কমিশন সংস্কৃতি বন্ধ: কমিশনভিত্তিক টেস্ট রেফারেল অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।
  • সরকারি হাসপাতালের উন্নয়ন: সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবা ও আস্থা বাড়লে মানুষ বেসরকারি ফাঁদে পড়বে না।
  • স্বাস্থ্যসেবা পর্যবেক্ষণ বোর্ড: স্বাধীনভাবে কাজ করবে এমন একটি তদারকি বোর্ড, যেখানে থাকবে প্রশাসন, চিকিৎসক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি।
  • চিকিৎসা কোনো পণ্য নয়: এটি মানবিক অধিকার। আজ সেই অধিকার পরিণত হয়েছে বাণিজ্যে। রোগীর কষ্টে, মৃত্যুর আতঙ্কে, ব্যবসায়ীদের লোভের হাসি শোনা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি ভেঙে পড়ছে, কারণ আমরা চিকিৎসাকে মুনাফায় পরিণত করেছি। হাসপাতাল এখন আর আশ্রয় নয়, ভয়ের জায়গা।

প্রশ্ন রয়ে যায়, এই দায় নেবে কে? সরকার, ডাক্তার, নাকি আমরা সবাই, যারা চুপচাপ দেখি মানুষের জীবন শেষ হতে একটি ক্লিনিকের ভুল প্রেসক্রিপশনে?

সময়ের দাবি

এই নীরবতা ভাঙা। স্বাস্থ্যসেবায় ফিরিয়ে আনতে হবে মানবিকতা, নীতি ও আস্থা। নচেৎ হাসপাতালগুলো হয়তো চলবে, কিন্তু চিকিৎসা চলে যাবে মৃত্যুর ঘরে।

জেএইচআর