শহরের ভিড় পথ, গ্রামের সরু কাঁচা রাস্তাও-প্রায় প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনার শোকাবহ সংবাদ আমাদের চোখে পড়ে। একজন মা, এক শিশু, একজন ছাত্র বা কর্মজীবী মানুষ-কারওই জীবনের কদর বুঝে না সড়কের রাশ টানার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। দুর্ঘটনা শুধু ব্যক্তিকে নয়, পরিবারকে ভেঙে দেয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি, সামাজিক প্রতিকূলতা ও মানসিক আঘাতও রেখে যায়। অথচ বহু দুর্ঘটনা অপ্রয়োজনীয়ই-সঠিক নীতিমালা, সামাজিক সচেতনতা ও প্রাঞ্জল পরিকাঠামো থাকলে এদের বড় অংশ রোধ করা সম্ভব।
এই উপ-সম্পাদকীয়তে আমরা বিশ্লেষণ করব কেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না, কী কারণ ও চ্যালেঞ্জ বিরাজমান এবং বাস্তবসম্মত, অগ্রগামিতা পূর্ণ সমাধান কী হতে পারে।
সড়ক দুর্ঘটনা বিচারে আমরা সংখ্যাকে অস্বীকার করতে পারি না: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সহ বিভিন্ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, প্রতি বছর লক্ষান্তরে মানুষ সড়ক দূর্ঘটনার বলি হয়; তাদের মধ্যে অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের রাস্তায় ঘটে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, গত কয়েক দশকে যানবাহন বাড়লেও সড়ক নিরাপত্তার বিনিয়োগ, শিক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা সমানুপাতে বাড়েনি। ফলে রুক্ষ রাস্তাঘাট, দুর্বল ট্রাফিক সংস্কৃতি, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন ও জরুরি সেবা অনিয়মিত-সব মিলিয়ে দুর্ঘটনা বাড়ায়। তদুপরি, দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবা পৌছানো দেরি হলে প্রাণহানি বাড়ে; দুর্যোগ-পরিচালনা ব্যবস্থা দুর্বল থাকাও সমস্যাকে জোরালো করে।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ বহুবিধ ও পারস্পরিক জড়িত। প্রধান কিছু কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:
দুর্বল অবকাঠামো ও রাস্তাঘাটের অবস্থা: অনেক পশ্চাতে থাকা এলাকায় রাস্তাগুলো সংকীর্ণ, আলোকিত নয়, সাইনবোর্ড বা গার্ড্রেইল নেই। বৃষ্টি বা বন্যায় রাস্তায় ধীরগতিতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কের গুণগত মান যেভাবে অবনতি হয়, ফোর-লেইন, চওড়া ফুটপাত, ওয়ার্টিং নিদর্শন না থাকলে, দুর্ঘটনা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
আইন-শৃঙ্খলার অভাব ও কম প্রয়োগ: গতানুগতিকভাবে ট্রাফিক আইন আছে, কিন্তু তার বাস্তব কার্যকরতা অনুপযুক্ত। নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা বা লাইসেন্স-প্রসেস দুর্বল হলে মানুষ সহজেই নিয়ম ভাঙে। উক্ত ভঙ্গগুলোর জন্য যথাযথ দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে পুনরাবৃত্তি ঘটে।
মানবীয় ত্রুটি-অবহেলা, অভ্যাস ও অদক্ষতা: অবহেলা, অতি-গতি, মাতাবাল অবস্থায় গাড়ি চালানো, মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে চালানো, সিটবেল্ট বা হেলমেট না ব্যবহার-এসব মনুষ্য-জাতীয় কারণও প্রধান ভূমিকা রাখে। ট্রাফিক সংস্কৃতি না গড়ে উঠলেও বিধি অমান্য সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে।
অপর্যাপ্ত ট্রেনিং ও ড্রাইভিং লাইসেন্স সিস্টেম: অনেক ক্ষেত্রেই ড্রাইভিং লাইসেন্স সহজলভ্য ও অনুদৈর্ঘ্য প্রক্রিয়া ছাড়া দেয়া হয়। প্রশিক্ষণের মান কম হলে নতুন ড্রাইভারদের দক্ষতা অপর্যাপ্ত থাকে-এটি বিপজ্জনক এক বাস্তবতা।
অসহায় জরুরি সেবা ও প্রাথমিক চিকিৎসার অনুপস্থিতি: দুর্ঘটনার পর সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও হাসপাতালে স্থানান্তর অনেক ক্ষেত্রে না হলে শয্যাশয্য প্রাণও হারায়। এম্বুল্যান্স সেবা, ট্রান্সপোর্টযোগ্যতা ও ট্রমা সেন্টার অপর্যাপ্ত থাকায় মৃত্যুহার বাড়ে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি: চাকরির তাগিদে দ্রুতগামী পরিবহন ব্যবহারের চাপ, মাঝরাস্তায় যাত্রী উঠানামা, মালবাহী ও যাত্রীবাহী যানবাহনের সংমিশ্রণ-এসবও ঝুঁকি বাড়ায়।
সমাধান: সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য কেবল একটি সেক্টরে কাজ করা হবে না; দরকার সমন্বিত- অবকাঠামো উন্নয়ন, আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা, প্রযুক্তি ও জরুরি সেবার সমন্বয়। কিছু বাস্তবনীতি ও নীতি-সঙ্গত সুপারিশ নিচে দেওয়া হলো:
রাস্তাঘাটের মানোন্নয়ন: প্রধান ও মাধ্যমিক রুটগুলোকে দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা; যথাযথ ড্রেন, গার্ড্রেইল, ফুটপাত ও বাইক লেন নিশ্চিত করা। গ্রামীণ রাস্তায়ও ডাস্টার কভারিং, ব্রিজিং ও চওড়া করণ জরুরি।
ট্রাফিক শান্ত অঞ্চল (Traffic Calming): স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকায় স্পিড ব্রেকার, রেডিয়াল রাউন্ডঅ্যাবে, চিহ্নিত ক্রসওয়াক ইত্যাদি স্থাপন করা। পথচারীকে রক্ষা করার উপায় তৈরি করা।
রাস্তায় আলো ও সাইনেজ: যথাযথ রাস্ট্রিক উপাত্তভিত্তিক রোড সাইন, রাস্তা আলোকসজ্জা ও রিয়া-সুরক্ষা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা।
ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন: স্পিডিং, ওভারলোডিং, ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালনা-এসব বন্ধে কড়া অভিযান করা। আইন-মাফিয়া ও অনিয়মজনিত দূর্নীতি রোধ করতে স্বচ্ছ মনিটরিং ব্যবস্থার প্রয়োজন।
ট্রাফিক পুলিশকে উৎসাহিত ও পেশাদার করা: আধুনিক সরঞ্জাম, ট্রেনিং ও অনুপ্রেরণা দিয়ে ট্রাফিক পুলিশ কর্মক্ষমতা বাড়ানো।
দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা: দুর্ঘটনায় দায়ী পক্ষের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য ট্রান্সপোর্ট কোর্ট বা ফাস্ট-ট্র্যাক সিস্টেম গঠন করা যেতে পারে।
প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স সংস্কার: ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার আগে কঠোর তত্ত্ব ও পারফরম্যান্স-ভিত্তিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা; নিয়মিত রি-ফ্রেশার ট্রেনিং ও চালকের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ চালু রাখা।
রোড সেফটি ক্যাম্পেইন: বিদ্যালয়, কলেজ, কাজের স্থানে ও গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে রোড সেফটি সচেতনতা বাড়াতে হবে: হেলমেট পরিধান, সিটবেল্ট, গতি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি।
কোম্পানি ও পরিবহন মালিকদের জবাবদিহিতা: বাস ও ট্রাক মালিকদের নিয়মিত ড্রাইভার ট্রেনিং ও বিশ্রাম সময় নিশ্চিত করতে হবে; ওভারটাইম বা জরুরি চাপ তাদের ওপর তুলে না দেয়া শ্রেয়।
স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম: সিগন্যাল অপটিমাইজেশন, স্পিড-ক্যামেরা, ওয়াই-ফাই/আইওটি-ভিত্তিক ট্রাফিক মনিটরিং-এসব প্রযুক্তি দুর্ঘটনা ও স্পিডিং নিয়ন্ত্রণে কার্যকর।
ডেটা-ভিত্তিক পকেট কন্ট: দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গার হটস্পট চিহ্নিত করে সেগুলোতে ফোকাস করা; সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ করে তদারকি বাড়ানো।
এপ্স ও ডিজিটাল সেবা: নাগরিকরা দুর্ঘটনা বা ঝুঁকি দেখলে দ্রুত রিপোর্ট করতে পারবে এমন প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারঅ্যাকটিভ সেবা গড়ে তোলা।
ট্রমা সে-নটর ও এম্বুল্যান্স নেটওয়ার্ক: প্রতিটি জেলায় ট্রমা কেয়ার ইউনিট স্থাপন; এম্বুল্যান্স মান ও দ্রুততার নিশ্চয়তা; হটলাইন সার্ভিস কার্যকর করা।
প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ: গণমানসে ‘বাই-স্ট্যান্ডার’ প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ চালু করা; স্কুল-কলেজ ও কমিউনিটিতে CPR এবং বেসিক ট্রমা কেয়ার শেখানো।
রোগী পরিবহন ও হাসপাতালে স্থানান্তর: দুর্ঘটনাস্থল থেকে নিকটস্থ হাসপাতালে দ্রুত ও সুষ্ঠু পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
রোড সেফটি ন্যাশনাল প্ল্যান: দীর্ঘমেয়াদি ন্যাশনাল রোড সেফটি রোডম্যাপ তৈরি করে, বাজেট বরাদ্দের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পরিকল্পনায় স্থানীয় সম্প্রদায়, এনজিও ও প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
বীমা ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা: আঘাতপ্রাপ্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ট্রান্সপোর্ট ইন্স্যুরেন্স ও গণবীমা নীতি চালু করা যেতে পারে।
নিয়ম শুধুমাত্র আইনগত নয়, নিয়ম মান্য করা মানে দাঁড়ায় সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন। শিশুকাল থেকেই ট্রাফিক আচরণ শিক্ষা দিতে হবে-স্কুলে সুরক্ষাভিত্তিক পাঠ্যসূচি, পরিবারে অভ্যেস এবং গণমাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক প্রচার। চালককে নিয়ম ভাঙলে সামাজিক নিন্দা-অভিযোগ প্রয়োগ করলে বারবার আইন ভঙ্গের মনোভাব কমে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও উদ্যোগী হয়ে রোড সেফটি নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
অটোনোমাস ড্রাইভিং, ADAS (Advanced Driver Assistance Systems), ইলেকট্রিক ভেহিকলগুলোর নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য-এসব প্রযুক্তি সড়ক নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা দেখতে হবে-প্রাথমিকভাবে স্পিড-সেন্সর, হার্ডব্রেক অ্যালার্ম, ব্যাক্রাডার ও ক্যামেরা-ভিত্তিক কন্ট্রোল দ্রুত ফলপ্রসূ হবে।
গণপ্রতিনিধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এনজিওরা কমিউনিটিতে রোড সেফটি কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে-স্থানীয় হটস্পট চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার, পথচারী সুরক্ষা উদ্যোগ ও অবচেতন ট্রাফিকের বিরুদ্ধে লড়াই। স্কুলছাত্র-ছাত্রী, কলেজবয়স্ক ইয়ুথ ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণে নিয়ে ছোট-ছোট অভিযানের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব-কিন্তু তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইলিউশনে ভর করে করা যাবে না। প্রয়োজন সাহসী নীতি, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসচেতনতা ও অর্থায়নের সুষম মিশ্রণ। প্রতিটি প্রাণ অনুপম; একটি পরিবারের ভাঙন, কর্মক্ষম জনশক্তির ক্ষতি বা মৃত ব্যক্তির জন্য শোক-এসব নিয়মিত মৃত্যুর সংখ্যা নয়, একেকটি সমাজের ক্ষতি। আমরা যদি আজই সিদ্ধান্ত নেই-রাস্তাগুলোকে নিরাপদ করে তোলা হবে-প্রতিটি স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার এলাকা রক্ষিত হবে-লাইসেন্স ও ড্রাইভিং সংস্কার করা হবে-জরুরি সেবা শক্তিশালী করা হবে-তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা রিহ্যাবিলিটেড ও নিরাপদ সড়কের উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারব।
এখানে ব্যক্তিগত অধ্যবসায়ও গুরুত্বপূর্ণ: নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী, চালক-যাত্রী-প্রতিজনকে নিয়ম মেনে চলা শিখতে হবে; এতে সমাজের চেহারাই বদলে যাবে। রাষ্ট্র যদি আইন প্রয়োগে কঠোর হয় আর সমাজ যদি আচরণগত পরিবর্তনে অংশ নেয়-তাহলেই সেই মিছিল ধীরে ধীরে থামবে, আর সড়কগুলো ফিরে পাবে জীবনের গান।
শেষ করব একটি আহ্বানে, প্রতিটি পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও সামাজিক মাধ্যম এই বিষয়কে গণজাগরণীয় হিসেবে তুলি ধরুক, রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা কাগজে নয়, মাঠে কাজ করে এটা জানান। কারণ প্রতিটি প্রাণই মূল্যবান, আর প্রতিটি নিরাপদ রোজগার, ক্লাসে আসা ছাত্রী, কর্মস্থলে যাওয়া ব্যক্তি-এসবই আমাদের দেশের প্রকৃত উন্নয়নের চিহ্ন।
জেএইচআর
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন