মৃতদেহও নিরাপদ নয়: মর্গের দেয়ালের ভেতরের এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার

ওমর ফারুক প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৫, ০১:২৪ পিএম
মৃতদেহও নিরাপদ নয়: মর্গের দেয়ালের ভেতরের এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার

মৃত্যু মানে বিশ্রাম। শান্তি। জীবনের সকল অস্থিরতা, লড়াই, অপমান থেকে চূড়ান্ত মুক্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এখন প্রশ্ন উঠছে-মৃত্যুতেও কি কেউ নিরাপদ নয়? ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এক তরুণীর মরদেহে বিকৃত যৌনাচারের ঘটনা সেই প্রশ্নটিকে আমাদের বিবেকের সামনে এমনভাবে দাঁড় করিয়েছে, যেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আর সম্ভব নয়।

একটি ঘটনার বিবরণ, যা ভাষাহীন করে দেয়: গত ১৯ অক্টোবর পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন হালুয়াঘাট উপজেলার এক তরুণী শিক্ষার্থী (২০)। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। কিন্তু ২০ অক্টোবর রাতে, যেই মর্গে তরুণীর মরদেহ রাখা হয় সেই সুরক্ষিত স্থানের ভেতরেই ঘটে এক অকল্পনীয় বর্বরতা।

পরদিন সকালে ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক লক্ষ্য করেন, মরদেহে যৌন নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। পরে তদন্তে ধরা পড়ে, মর্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত মরদেহবাহক আবু সাঈদই (১৯) এই বিকৃত যৌনাচারের নায়ক। গ্রেপ্তারের পর আদালতে সে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এই ঘটনায় শিক্ষার্থী-জনতা হালুয়াঘাটে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে, বক্তারা বলেছেন, এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতার অপমান, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।

ঘটনার পুনরাবৃত্তি: তিন বছরে তিন মর্গ, তিন নারী: এটি কোনো একক ঘটনা নয়। বাংলাদেশে এর আগেও ২০২০ ও ২০২২ সালে একই ধরণের ভয়ঙ্কর অপরাধ ঘটেছে। ২০২০ সালে, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঁচটি মরদেহে একই ব্যক্তির বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়। অভিযুক্ত মুন্না ভক্ত স্বীকার করেন তিনি একাধিক নারীর মরদেহে বিকৃত যৌনাচার করেছেন। ২০২২ সালে, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে মর্গের পাহারাদার মো. সেলিম গ্রেপ্তার হন একই অভিযোগে।

আর ২০২৫ সালের অক্টোবরে, ময়মনসিংহে পুনরাবৃত্ত হলো সেই নৃশংসতা এইবার শিকার আত্মহত্যাকৃত এক তরুণী।

তিনটি ঘটনার মধ্যে একটি মিল সব জায়গায় অপরাধী ছিল হাসপাতালের কর্মী বা সহযোগী, এবং তিন জায়গাতেই ভুক্তভোগী ছিল নারীর মরদেহ।

মৃতদেহের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের এই বিকৃত প্রবণতাকে বলা হয় নেক্রোফিলিয়া (Necrophilia)। ব্রিটানিকা একে সংজ্ঞায়িত করেছে, “মৃতদেহকেন্দ্রিক যৌন আকর্ষণ বা কর্মকাণ্ড।” মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা একে একধরনের সাইকোসেক্সুয়াল ডিসঅর্ডার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে এর পেছনে মানসিক বিকারের পাশাপাশি আছে সামাজিক অবহেলা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা, যেখানে নৈতিকতা ও তদারকি একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে।

বিশ্বজুড়ে নেক্রোফিলিয়ার ইতিহাসও ভয়ঙ্কর। প্রাচীন মিশরীয় সমাজে সুন্দরী নারীর মরদেহ তিন দিন পাহারা দেওয়া হতো, যেন কোনো বিকৃত ব্যক্তি মরদেহের প্রতি যৌন আগ্রহ না দেখায়। আজ, হাজার বছর পরও, বাংলাদেশের মর্গগুলোতে সেই একই আশঙ্কা ফিরে এসেছে।

আইনের ফাঁদে মরদেহের ন্যায়বিচার: এমন ঘৃণ্য অপরাধের পরও বাংলাদেশে নেক্রোফিলিয়া নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তদন্তকারী সংস্থাগুলো বাধ্য হয়ে মামলা করছে দণ্ডবিধির ২৯৭ ও ৩৭৭ ধারায়। ধারা ২৯৭: মৃতদেহ বা সমাধিস্থলের প্রতি অসম্মান বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড। ধারা ৩৭৭: “পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ যৌন সম্পর্কের” জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড।

কিন্তু এখানেই আইনি সমস্যা। কারণ ৩৭৭ ধারায় ‘মৃতদেহ’ বলা হয়নি। ফলে অনেক সময় আইনজীবীরা যুক্তি দেন, “মৃত ব্যক্তি জীবিত নয়, তাই যৌন সম্পর্কের প্রশ্নও ওঠে না।” এই মারপ্যাঁচে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

আইনজীবী মিতি সানজানা যথার্থই বলেছেন, যখন মৃতদেহের ওপর যৌন নির্যাতন ঘটে, সেখানে তো সম্মতির কোনো ইস্যু নেই। তবু কেন সেটি ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে না?
অর্থাৎ- ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন করে ‘মৃতদেহ’কে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে, বাংলাদেশে এমন অপরাধের সঠিক বিচার কখনোই সম্ভব নয়।

বিশ্বে কোথায় কী আইন আছে: বিশ্বের অনেক দেশ এই বিকৃত আচরণের শাস্তি নির্ধারণ করেছে।

যুক্তরাজ্য: Sexual Offences Act 2003-এর ৭০ ধারায় নেক্রোফিলিয়াকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; সর্বোচ্চ আজীবন কারাদণ্ড।

যুক্তরাষ্ট্র: অন্তত ১৭টি অঙ্গরাজ্যে পৃথকভাবে এই অপরাধের বিধান আছে; শাস্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড।

ভারত: যদিও সরাসরি আইন নেই, তবে IPC ৩৫১ ধারা অনুযায়ী এটি ‘আক্রমণাত্মক আচরণ’ হিসেবে দণ্ডনীয়, শাস্তি ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

অথচ বাংলাদেশে তিন-তিনটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেও এখনও পর্যন্ত আইন সংশোধনের উদ্যোগ পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়: প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের মর্গ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এখনো সেখানে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, নৈতিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা টহল বা মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিং কিছুই নেই।

২০২২ সালের চট্টগ্রাম মেডিক্যাল ঘটনার পর তৎকালীন পরিচালক ফরিদ হোসেন বলেছিলেন, “মর্গে নিরাপত্তা জোরদারে চিঠি পাঠানো হয়েছে।” কিন্তু দুই বছর পর ময়মনসিংহের এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সেই নিরাপত্তা কাগজেই সীমাবদ্ধ।

এই ব্যর্থতার দায় শুধু এক মরদেহবাহকের নয়, এটি গোটা ব্যবস্থার। একটি মরদেহ, যার পাশে পরিবারের সদস্যরা দাঁড়াতে পারেনি, যে মর্গের ভেতর ‘আইনি জটিলতা’র অজুহাতে পরিবারকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, সেই মর্গেই মরদেহের মর্যাদা পদদলিত হলো!

মানবিক শিক্ষা ও নৈতিক পতন: নেক্রোফিলিয়া কেবল আইনি নয়, এটি নৈতিকতার সংকটও। যে সমাজ জীবিত নারীকে নিরাপদ রাখতে পারে না, সেই সমাজের মর্গেও নারীর দেহ অবমানিত হবে এ যেন এক নীরব ধারাবাহিকতা।

এখানে ব্যর্থ হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসন ও সামাজিক মূল্যবোধ। যে তরুণ (আবু সাঈদ) এমন বিকৃত কাজ করল, সে তো এই সমাজেই বড় হয়েছে, এই সমাজেই শিখেছে কীভাবে ক্ষমা পাওয়া যায়।

আইন নয়, বিবেক জাগরণের সময়: এই ঘটনাগুলোর পর সবচেয়ে জরুরি হলো, আইন সংশোধন করে নেক্রোফিলিয়াকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, মর্গ ও হাসপাতালগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, মর্গ কর্মীদের মানসিক পরীক্ষা ও নৈতিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।

একই সঙ্গে, সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবিকতা ও সহানুভূতির শিক্ষা জোরদার করতে হবে। কারণ যতক্ষণ না আমরা শিখব জীবনের মূল্য, ততক্ষণ মৃত্যু পর্যন্ত থাকবে অপমানিত। যে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল, হয়তো ভেবেছিল মৃত্যু তাকে মুক্তি দেবে। কিন্তু এই রাষ্ট্র, এই সমাজ তাকে মৃত্যুর পরও শান্তি দেয়নি।

মর্গের দেয়ালের ভেতর এই অপরাধ কোনো একক বিকৃত ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের সবার বিবেকের পতনের প্রতীক।

একটি জাতি হিসেবে প্রশ্ন রেখে যাই, আমরা কি এতটাই মৃত যে মৃতদেরও রক্ষা করতে পারি না?

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

জেএইচআর