বাংলাদেশ আবারও এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চলছে প্রবল আলোচনা, সমালোচনা, সন্দেহ ও সংশয়।
কেউ বলছেন, নির্বাচন নিয়ে জাতির মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে; আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন এ যেন আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হওয়া। একদিকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তাদের সনদ প্রস্তাব দিয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক পরিসরে ঝড় বইছে। কেউ একে বলেছেন “প্রতারণার সনদ”, কেউ বলেছেন “অনৈক্যের ঘোষণা”।
অন্যদিকে কিছু রাজনৈতিক দল গণভোটের দাবি তুলেছে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে, বা তাদের ভাষায় গণতন্ত্রের নতুন ভিত্তি স্থাপন করতে। কিন্তু এই সমস্ত প্রস্তাব ও পাল্টা-প্রস্তাবের ভিড়ে মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে এই রাজনৈতিক অনৈক্যের মধ্যেও কি সত্যিই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব?
ঐক্যের সনদ নাকি নতুন অনৈক্যের সূত্র?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতীয় সনদকে অনেকেই দেখছেন নতুন ধরনের এক রাজনৈতিক চুক্তি হিসেবে যার লক্ষ্য হতে পারে বিভিন্ন মত ও দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম বোঝাপড়া গঠন করা। তবে প্রশ্ন হলো, এই সনদে কি সত্যিই ঐক্য আছে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক প্রদর্শনীর অংশ?
সমালোচকেরা বলছেন, ঐকমত্য কমিশন সনদে অনেক আদর্শিক কথা থাকলেও তার বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর কাঠামো নেই। কেউ কেউ একে “অনৈক্যের সনদ” বলছেন কারণ, ঐকমত্য কমিশন গঠিত হলেও তা সকল দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে কোনো সরাসরি আলোচনাও এখনো হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যদি কোনো জাতীয় ঐক্য গঠিত হয়, তবে তা হতে হবে আস্থা ও পারস্পরিক স্বীকৃতির ভিত্তিতে, কেবল ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে নয়। অন্যথায় এই সনদ কাগজে থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে তার প্রভাব সীমিত থেকে যাবে।
গণভোটের দাবি: গণতন্ত্র নাকি কৌশল? নির্বাচনের আগে কয়েকটি দল 'গণভোট' আয়োজনের প্রস্তাব তুলেছে। তাদের যুক্তি নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো, বা জাতীয় ঐক্যমত কমিশন সনদ সম্পর্কে জনগণের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। তবে এই ধারণা নিয়ে আইনি ও বাস্তব উভয় প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের যে ধারাটি (অনুচ্ছেদ ১৪২) ছিল, তা কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। বাস্তবে কোনো গণভোট আয়োজনের আইনি কাঠামো বা প্রশাসনিক সক্ষমতা এখন নেই।
তাছাড়া, নির্বাচন সামনে রেখে গণভোট আয়োজনের দাবি অনেকের কাছে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল বলে মনে হচ্ছে। কারণ, গণভোটের ফলাফল যাই হোক, তা বাস্তবে কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে না। ফলে, এটি হতে পারে রাজনৈতিক মঞ্চে আলোচনার অস্ত্র কিন্তু রাষ্ট্রপর্যায়ে সমাধানের পথ নয়। তবুও একথা ঠিক, জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি এখন সময়ের দাবি।
গণভোটের ধারণা যদি আন্তরিকভাবে তোলা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের সংস্কার ও পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।
রাজনৈতিক অবিশ্বাসের সংস্কৃতি: বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে অবিশ্বাসের এক দুষ্টচক্রে আবদ্ধ। সরকার ও বিরোধী দল কেউই পরস্পরের প্রতি আস্থা রাখতে পারে না। এর ফলে প্রতিটি নির্বাচনই হয়ে ওঠে ক্ষমতার লড়াই, রাষ্ট্রীয় আস্থার পরীক্ষা নয়। আজকের পরিস্থিতিও তারই পুনরাবৃত্তি। জাতীয় ঐক্যমত কমিশন সনদ, বিরোধী দলের গণভোট দাবি, সরকারের প্রশাসনিক প্রস্তুতি সব কিছুই যেন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে দরকার ছিল আলোচনার টেবিলে বসা, সেখানে চলছে বিবৃতি যুদ্ধ, সংবাদ সম্মেলন ও পারস্পরিক দোষারোপ।
রাজনীতি থেকে বিশ্বাসের সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর সংকেত। কারণ, বিশ্বাস ছাড়া কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সরকারের করণীয়: প্রশাসন ও আস্থার সমন্বয় এই কঠিন বাস্তবতায় সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে—কীভাবে তারা এই বিভাজন মোকাবিলা করবে এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করবে। সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশাসনিক প্রস্তুতি: নির্বাচন আয়োজন একটি বিশাল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের আগে প্রায় ছয় লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরাসরি দায়িত্ব পালন করেন যাদের মধ্যে আছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, আনসার, শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মচারী। তাদের প্রশিক্ষণ, নিরপেক্ষ আচরণ ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা এখনই শুরু করতে হবে। যদি তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে নির্বাচনের ফল যত ভালোই হোক, তা জনগণের চোখে বিশ্বাসযোগ্য হবে না।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ: প্রতিটি নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ জনগণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। অতীতে দেখা গেছে কোনো কোনো বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নির্বাচনের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। তাই এবার প্রয়োজন নতুন প্রশিক্ষণ, নতুন আচরণবিধি ও জবাবদিহির কাঠামো।
নির্বাচনকালীন সময়ে বাহিনীগুলোর দায়িত্ব হবে ভয়মুক্ত ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, কোনো পক্ষের হয়ে কাজ না করা, এবং জনগণের নিরাপত্তা বজায় রাখা।
আস্থার সংকট দূরীকরণ: সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক আস্থার সংকট। এক্ষেত্রে আন্তঃদলীয় আলোচনাই হতে পারে একমাত্র পথ। যদি সরকার বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তাহলে জনগণের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা যাবে যে সরকার ক্ষমতা রক্ষায় নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: নির্বাচন কমিশন এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। জনগণের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতাই নির্ধারণ করবে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন আছে। ভোটার তালিকা, আসন বিন্যাস, প্রার্থিতা যাচাই সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। এজন্য সরকারের উচিত প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সহায়তা দিলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে হস্তক্ষেপ না করা।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব: গণতন্ত্র কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। বিরোধী দলেরও দায়িত্ব আছে আলোচনায় অংশ নেওয়া, সহিংস রাজনীতি পরিহার করা, নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া, এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু দল এখনো নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিচ্ছে, কেউ আবার শর্ত আরোপ করছে। এই মনোভাব জাতির জন্য ক্ষতিকর। কারণ, গণতন্ত্রে জয়-পরাজয় চূড়ান্ত নয়, বরং অংশগ্রহণই হলো বিজয়।
জাতি ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা: একটি সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দল নয়—সমগ্র জাতির যৌথ দায়িত্ব। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও তরুণ প্রজন্মকেও সক্রিয় হতে হবে। তারা যেন “নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক” নয়, বরং সচেতন নাগরিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখে।
প্রত্যেকে যেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে দাবি তোলে “আমরা চাই ভোটের অধিকার, কিন্তু তার চেয়ে বেশি চাই বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ।” জনগণের এই চাওয়াই রাজনৈতিক দলগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারে।
নির্বাচন আয়োজনের বাস্তবতা: এখন প্রশ্ন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেই কি নির্বাচন আয়োজন বাস্তবসম্মত? প্রশাসনিক দৃষ্টিতে সম্ভব হলেও রাজনৈতিক দৃষ্টিতে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া নির্বাচন করা গেলে তা আইনি হবে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। সুতরাং সরকারের উচিত সময় নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করা। প্রয়োজনে ভোটের তারিখ সামান্য পিছিয়ে দিলেও তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে, যদি তাতে অংশগ্রহণ বাড়ে ও আস্থা ফিরে আসে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ কঠিন এক পরীক্ষার মুখে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঐক্যের ভান, প্রশাসনিক জটিলতা ও জনগণের উদাসীনতা—সব মিলিয়ে সামনে এক কঠিন পথ।
তবুও আশার কথা হলো, এই জাতি বারবার সংকট অতিক্রম করেছে। এখন প্রয়োজন সহনশীলতা, সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থা। সরকার যদি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করে, বিরোধী দল যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়, আর নাগরিক সমাজ যদি সক্রিয় থাকে—তাহলে এই নির্বাচন হতে পারে সত্যিকারের গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম।
গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন সবাই পরাজয় মেনে নিতে শেখে, আর জয়ের পরও অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে জানে। বাংলাদেশের আজ সেই শিক্ষার দোরগোড়ায়। সামনে যা আছে, তা কেবল একটি নির্বাচন নয়—বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধ্যায়।
লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন