১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয়, গৌরবময় দিন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অসংখ্য শহীদের আত্মদান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অকুতোভয় সাহসিকতার মধ্য দিয়ে এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা ছিনিয়ে এনেছিল কাঙ্ক্ষিত বিজয়।
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই মহান দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সকল বীর সন্তানকে এবং সালাম জানাই জীবিত ও প্রয়াত সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।
মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই নয়; এটি ছিল ভাষা, সংস্কৃতি, অধিকার ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে চেতনার জন্ম, তা-ই ধীরে ধীরে পরিণত হয় স্বাধীনতার আন্দোলনে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এ দেশের সাধারণ মানুষ কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের জনগণ।
এই সংগ্রামে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন বাংলার সেই দামাল ছেলেরা যারা জীবনকে তুচ্ছ করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন দেশের মুক্তির জন্য। তাদের অনেকেই ছিলেন তরুণ, কেউ ছাত্র, কেউ গ্রামের সাধারণ যুবক। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ না থাকা সত্ত্বেও সীমাহীন সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। জীবন-মৃত্যুর মায়া ত্যাগ করে তারা প্রমাণ করেছিলেন স্বাধীনতার মূল্য রক্ত দিয়েই দিতে হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ত্রিশ লক্ষ মানুষ শহীদ হন বলে আমাদের বিশ্বাস, দুই লক্ষাধিক মা-বোন নির্যাতনের শিকার হন, লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করেন। এই আত্মত্যাগের বিনিময়েই এসেছে বিজয়। ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের। সেই বিজয় ছিল শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবিক মর্যাদার বিজয়।
আজকের এই গৌরবময় দিনে আমরা শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। মহান আল্লাহ যেন তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তাদের রক্তের ঋণ কোনো দিন শোধ হবার নয়। একই সঙ্গে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের ত্যাগ ও সাহসে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা, স্বাধীন আকাশে নিশ্বাস নেওয়ার অধিকার।
বীর মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের জাতির গর্ব। তাদের সম্মান রক্ষা করা, তাদের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে অসাম্প্রদায়িকতা, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদার প্রতি অঙ্গীকার। এই চেতনাকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার পথে।
আজকের প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা কোনো ঘটনা নয় এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। বিজয়ের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশপ্রেম, সততা ও দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে কাজ করলেই শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা পূর্ণতা পাবে। অন্যথায় স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে।
দৈনিক আমার সংবাদ ও দ্য ডেইলি পোস্টের পক্ষ থেকে মহান বিজয় দিবসে আমরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তাদের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সকল বীর সন্তানদের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও দোয়া।
মহান বিজয় দিবস আমাদের শিখিয়ে যায় একটি জাতি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো শক্তিই তাকে দাবিয়ে রাখতে পারে না। সেই শিক্ষাকে ধারণ করে আসুন, আমরা সবাই মিলে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ইএইচ
আমার সংবাদের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন